বর্ধমানের চিঠি – ১২

Reading Time: 4 minutes

বাংলা পঞ্জিকার মাস-ঋতু পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন। চৈত্র কিভাবে বসন্তের মতো একটি রোমাঞ্চকর ঋতুর অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে, তা ভাবতে ভাবতে বর্ধমান রেলওয়ে জংশনের তিন নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে হুগলির গুড়াপ অভিমুখী ট্রেনে চাপলাম। মিনিট চল্লিশের ভ্রমণ, জরুরী কাজে বন্ধুর কাছে যাচ্ছি। এখন পড়ন্ত বিকেল। জানালার পাশের সিটে বসায় পশ্চিমে হেলে পড়া সূর্য দিনের শেষ উত্তাপ ফেলে আমার মুখে ক্রমাগত ঘাম উদগিরন করে চলেছে। যেন হাজার জনমের শত্রুতা।

বার বার ঘাম মুছে পশ্চিম বাংলার প্রকৃতি দেখছি। বিপরীত আসনে মুখোমুখি একটি কিশোরী মেয়ে বসেছে। পুরো পরিবারের সাথে হাওড়া যাচ্ছে। মেয়েটির ছোটভাই বসেছে আমার পাশে। ভাইবোনের খুনসুটিতে ভ্যাপসা গরমেও স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লাম। আমার ছোটবোনের কথা মনে হলো।

আমি মনোযোগ দিলাম অবারিত সবুজের প্রান্তরে। গ্রামগুলো সুন্দর। খুবই মনোরম। মনে মনে গাইছি “ধন-ধান্যে পুষ্পে ভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা” গানটি। সূর্যের উত্তাপ এখন তেমন একটা অনুভূত হচ্ছে না। একবার চেয়ে দেখলাম সূর্যটা। ওটা এখন পশ্চিমে। তারও পশ্চিমে পুরো একটি পৃথিবী আছে, যেখানে একটু একটু করে ভোর হচ্ছে।

গুড়াপ স্টেশনটি মাঝারি আকারের। এটি একটি থানাশহর। অনুচ্চ কিছু আবাসিক ভবন আর অফিস-আদালত নিয়ে গ্রামীণ শহরটি বেশ সুখী মনে হলো। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসায় পাখপাখালির কলরব শোনা যাচ্ছে। শহরটি ঘন সবুজে ঘেরা। গোধূলির প্ল্যাটফর্মে তেমন যাত্রী নেই। বন্ধুর অপেক্ষায় একটি ছাউনিতে বসতে গেলাম। তিন মাতাল পরস্পরকে ইচ্ছেমতো বাঁশ দিয়ে পেটাচ্ছে দেখে আর বসতে সাহস পেলাম না। প্ল্যাটফর্ম পেরিয়ে কিছুটা বাইরের দিকে একটি পুরনো গাছের নিকট গিয়ে বসলাম।

গুড়াপ স্টেশন/ ছবি: লেখক

নানাবিধ চিন্তায় মস্তিষ্কে ঝড় বইছে। হঠাৎ এক গেরুয়া বস্ত্র পরিহিত ও লম্বা জট পাকানো চুলের মাঝবয়সী এক সাধুবাবা কিসিমের ব্যক্তি এসে সরাসরি আমার পাশে বসে গেলেন। খানিকটা ভীতসন্ত্রস্ত নয়নে তার দিকে তাকালাম। মনে মনে ভাবছি দৌঁড়ে পালাই, কিন্তু শরীর দাঁড়ালো না! পরিস্থিতি হালকা করতে প্রণাম জানালাম। দরাজকন্ঠে সাধুবাবা নাম জানতে চাইলেন। হাজার রকম চিন্তা করে একটি ছদ্মনাম বললাম। তিনি মুচকি হাসলেন, তবে কিছু বললেন না।

প্রায় দশমিনিট ধরে দুজন বসে আছি। আমার ভয় কেটে গেছে। কিন্তু কেউই কিছু বলছি না। সাধুবাবা হঠাৎ কাঁধের ঝোলা মাটিতে বিছিয়ে বেশ কয়েকটি পুরনো বই বের করলেন। কিছু পুরনো কাগজ আর একটি দোয়াত-কলমও দেখলাম। কিছুটা আশ্চর্য হলাম। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার কর্মকান্ড দেখতে লাগলাম। তিনি কিছুক্ষণ উপরের দিকে চেয়ে কিছু ভাবেন, মুখে কীসব বুলি আওড়ান, এরপর কাগজে লিখতে থাকেন।

এভাবে কিছুক্ষণ চলার পর আর চুপ থাকতে পারলাম না। সরাসরি তাঁর পরিচয় জানতে চাইলাম। তিনি কথা বললেন না। এবারও মুচকি হাসি দিলেন। এরপর একটি ভারী পুরনো বই আমার হাতে দিয়ে পড়তে ইশারা করলেন। বইটির বেশীরভাগ পাতা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। প্রচ্ছদের কোন লেখা পাইনি। পাতা উল্টিয়ে বেশকিছু কবিতা দেখতে পেলাম। পুরনো লেখা, বুঝতে বেশ কষ্ট হচ্ছিলো। হঠাৎ একটি কবিতার কিছু লাইন পড়ে থমকে গেলাম। পুনরায় চোখ বুলিয়ে দেখলাম লেখা আছে,

“অন্নপূর্ণা উত্তরিলা গাঙ্গিনীর তীরে |

পার কর বলিয়া ডাকিলা পাটনীরে ||

সেই ঘাটে খেয়া দেয় ঈশ্বরী পাটনী |

ত্বরায় আনিল নৌকা বামাস্বর শুনি ||”

মনে পড়লো কবিতাটি কোথায় যেন পড়েছি। বিস্ফোরিত চোখে সাধুর দিকে তাকালাম। আরও স্তম্ভিত হয়ে লক্ষ্য করলাম সাধুবাবা কখন উঠে গেছেন। প্রায় দৃষ্টিসীমার দূরবর্তী কোণে একটি গেরুয়া অবয়বের ছুটে চলা দেখলাম শুধু। ভেতরটা ধ্বক করে উঠলো। সামনেই একটি কাগজ পেলাম, যেটাতে উনি এইমাত্র লিখছিলেন। কাগজটি হাতে নিলাম। টানা অক্ষরে কয়েকটি পদ্যচ্ছত্র লেখা। নীচে স্বাক্ষর করা “ভারতচন্দ্র”!

এবার ঠিকই মনে করতে পারলাম পূর্বোক্ত কবিতার নাম। কিন্তু, মধ্যযুগের শেষ ও অষ্টাদশ শতকের শ্রেষ্ঠ বাংলা কবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের কবিতার বই এই সাধুবাবার কাছে কেন, তা ভেবে শিহরিত হলাম। আর, সদ্যরচিত এই পদ্যচ্ছত্রের নীচে ভারতচন্দ্রের স্বাক্ষর? এটা তো এই সাধুবাবা আমার সামনে বসে লিখে গেলেন!

গুড়াপ শহরের বাইরে গ্রাম্য রাস্তায় লেখক

সন্ধ্যা হয়ে গেছে। বন্ধুও চলে এসেছে আমাকে নিতে। সে এসেই অনাকাঙ্ক্ষিত দেরির জন্য মূহুর্মূহু ক্ষমা চাইলো। গুড়াপ স্টেশনের বাইরে বেরিয়ে ওর বাইকে উঠিয়ে শহরের বাইরের একটি রাস্তায় নিয়ে গেলো। আমার মস্তিষ্কে প্রলয়ঙ্করী ঝড় বইছে। কি হলো, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তৎক্ষণাৎ বন্ধুকে বলে স্টেশনে ফিরে এলাম। একটি মিষ্টির দোকানে ওকে নিয়ে মিষ্টি খেলাম। তারপর সোজা স্পেশাল ট্রেনে চেপে বর্ধমানের দিকে রওনা দিলাম।

এবারও জানালার পাশে বসেছি। মৃদুমন্দ বাতাসে শরীর জুড়ালেও মন জুড়াচ্ছে না। কিছুক্ষণ আগের ঘটে যাওয়া ঘটনার বিশ্লেষণী বার্তা বয়ে চলেছে নিউরন থেকে নিউরনে। মস্তিষ্কের কর্মাধ্যক্ষরা রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেও কোন কূলকিনারা বের করতে পাচ্ছে না। অবশেষে অবচেতন মনে অনুসিদ্ধান্তে পৌঁছুলাম যে, বর্ধমানের পার্শ্ববর্তী এলাকা পান্ডুয়ায় ১৭১২ সালে জন্ম নেয়া বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র প্রদত্ত উপাধিপ্রাপ্ত কবি “রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র”, যিনি ১৭৬০ সালেই ইহলীলা সাঙ্গ করে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন, ব্যাখ্যাতীত কোন দৈবচক্রে অদ্য সন্ধ্যায় গুড়াপ স্টেশনে সেই মহাত্মার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ ঘটেছে।

মনকে বুঝিয়ে যখন ঝিমুনি চলে এসেছে, তখনই কবি ভারতচন্দ্রের কবিতাংশটি মনে পড়লো। ঈশ্বরপাটনী নামটি বেশ পরিচিত মনে হচ্ছিলো। কিয়ৎক্ষণ পরেই মনে পড়লো, ইংরেজ আমলের এক নীলকুঠির কথা। নাম তার পিতলগঞ্জ। ব্রহ্মপুত্রের শাখানদী কাঁচামাটিয়ার উত্তাল ঢেউয়ে ভেসে আসা পলিসমৃদ্ধ উর্বর অঞ্চল ছিলো সেই পিতলগঞ্জ। রাজগৌরীপুরের জমিদারদের পরগণায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মালিক অত্যাচারী নীলকর সাহেবদের হাতে তৈরী একটি বাজার ছিলো পিতলগঞ্জ। বাজারের পাশ দিয়ে বয়ে চলা নদী পারাপার করতেন এক সাধারণ খেয়ামাঝি। নাম তার ঈশ্বরপাটনী।

ভয়ঙ্কর অত্যাচারী ইংরেজ নীলকরদের তান্ডবে পিতলগঞ্জের ব্যবসায়ীদের প্রাণ ওষ্ঠাগত। নিত্যদিনের অত্যাচারে জর্জরিত চাষীদের আর্তচিৎকারে পিতলগঞ্জের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিলো। প্রতিবাদ করার মতো কেউ নেই। দেশীয় রাজা-জমিদাররাও নীরবে সবকিছু মেনে নিতেন। ইংরেজ শাসকের খাস চামচা ছিলেন কি না!

এমনই একদিন নীলকর সাহেবের চাবুকের আঘাতে চাষীদের আর্তচিৎকার শুনে নিজেকে ঠিক রাখতে পারেন নি পিতলগঞ্জ বাজারের সকলের প্রিয় খেয়ামাঝি ঈশ্বরপাটনী। দৌঁড়ে গিয়ে নীলকর সাহেবকে নিবৃত্ত করতে চাইলেন। ঈশ্বরপাটনী শাল কাঠের বৈঠা হাতে নিয়ে দৌঁড়ে যান এবং চিৎকার করে বলতে থাকেন ‘সাহেব চাবুক মারাবন্ধ কর’। ইংরেজ সাহেবগণ এতেক্ষুব্ধ হয় এবং ঈশ্বরপাটনীর গায়ে চাবুক চালাতে থাকে। ঈশ্বরপাটনীর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায় এবং হাতের বৈঠা দিয়ে ইংরেজ সাহেবের মাথায় আঘাত করে। এতে করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে নীলকুঠির সাহেব। রক্ত ঝরতে থাকে তার। রক্তক্ষরণে এক পর্যায়ে নীলকুঠির সাহেব মারা যায়।

সৃষ্টি হয় ভীতসন্ত্রস্থ অবস্থা। পিতলগঞ্জের অবস্থা হয়ে পড়ে থমথমে। পিতলগঞ্জে যেনো ঝড় হইতে থাকে এই ঘটনায়। সমগ্র বাংলায়ও এর প্রভাব পড়ে। দেশপ্রেমিক ঈশ্বরপাটনীও প্রাণে বাঁচতে পারেননি। ভেঙে যায় পিতলগঞ্জের বাজার। কালের গর্ভে হারিয়ে যায় একটি গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস।

পরবর্তীতে তৎকালীন গৌরীপুরের জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর চৌধুরী দত্তপাড়া চরনিখলা মৌজায় বাজার স্থাপন করার জন্যে জমি দান করেন। তিনি ঈশ্বরপাটনীর নামের ঈশ্বরের সঙ্গে গঞ্জ যোগ করে বাজারের নাম দেন ঈশ্বরগঞ্জ। সেই ঈশ্বরগঞ্জ ময়মনসিংহের একটি উপজেলা হয়ে এখনও টিকে আছে। যদিও পিতলগঞ্জের সেই গর্বিত বীর ঈশ্বরপাটনীর প্রতিবাদী বিপ্লবের ইতিহাস আজও অনেকের অজানাই রয়ে গেছে!

লম্বা হর্ণ দিতে দিতে হাওড়া-বর্ধমান স্পেশাল ট্রেনটি বর্ধমান জংশনে প্রবেশ করলো। ট্রেন থেকে নেমে ঐতিহ্যবাহী বি.সি. রোড ধরে এগিয়ে চলছি হোস্টেলের উদ্দেশ্যে। বর্ধমান রাজবাড়ির ঠিক পেছনে, রাজস্কুলের পূর্বপাশে মোগল সম্রাজ্ঞী নূরজাহান ওরফে মেহেরুন্নিসার প্রথম স্বামী শের আফগানের সমাধিক্ষেত্রের নিকটে…

-মেহেদী কাউসার ফরাজী/৩১.০৩.২০১৯ খ্রিঃ/বর্ধমান।

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!