বিলিয়নিয়ারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ: বৈশ্বিক এলিটের মুখোমুখি রেডিক্যাল

Reading Time: 14 minutes

রুটগার ব্রেগম্যান ও উইনি বিয়ানিমা যখন দাভোসে কর নিয়ে কথা বলেছেন তখন সেটা ভাইরাল হয়েছিলো। কেন পরিবর্তন আসছে সে বিষয়ে তাঁরা কথা বলেছেন ‘উইনারস্‌ টেইক অল’ বইয়ের লেখক আনন্দ গিরিধারাদাসের সাথে।

রুটগার: উইনি, আপনি ও আমি বিলিয়নিয়ার ও কর নিয়ে যেসব মন্তব্য করেছি সেগুলো কেন ভাইরাল হলো? ঠিক এ সময়ে বিষয়গুলো কেন পরিবর্তিত হচ্ছে বলে মনে হয়?

উইনি: আমরা কেন ভাইরাল হলাম? আমার মনে হয় আমরা যা বলেছি সেটা মানুষ শুনতে চেয়েছে, বিশেষ করে একটি বড় মঞ্চে যেখানে ক্ষমতাবান রাজনীতিবিদ ও কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিত্ব থাকে। আর এসব কথা কদাচিৎ বলা হয়। মানুষ সেখানে গিয়ে পরোক্ষ শব্দে কথা বলে ও নিজেদের প্রশস্তি গায় এবং নিজেদের পছন্দসই পরিসংখ্যান আঁওড়ায়, কিন্তু মানুষ যে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয় সেটা আমরা একবারই সোজাসাপ্টা বলেছি।

রুটগার: আমি আজ গ্যালাপ থেকে কিছু চমকপ্রদ পরিসংখ্যান দেখলাম যেখানে বলা হচ্ছে, ১৯৯০ এর দশকের শেষ হতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ মানুষ চেয়েছে ধনীরা আরো বেশি কর দিক। মানুষের মেজাজে যে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে, সে চিহ্ন দেখা যাচ্ছে।

উইনি: বামপন্থীরা ঘুমিয়ে আছে কিনা আমি জানি না, কিন্তু একটি প্রকট বয়ান আছে যা কিনা মিডিয়াতে অবিসংবাদিত থেকে গেছে। এই বয়ান যে ইঙ্গিত দেয় তা হচ্ছে অতি-ধনী ও নিদারুণ দারিদ্র্যের মাঝে কোনো সংযোগ নেই, মানে আপনি ধনী থেকে আরো ধনী হতে থাকবেন, এবং মানুষের অধিকতর গরীব হওয়ার সাথে এর কোনো যোগ নেই। আর এটা সবসময়ই ওরকম ছিলো না, আগে মানুষ জেনেছে যে উপরের তলায় বৃদ্ধি পাওয়া মানে আপনি কাউকে আরো নিচের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। সত্যকে আবার সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে এটা জানতে পারলে মানুষের ক্ষমতায়ন হবে।

আনন্দ: বয়ানের ধারণা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমার মনে হয় আপনারা দু’জনে দাভোসে যার মাঝে নিজেদের আবিষ্কার করেছেন এবং বিগত কয়েক মাস যাবত আমি আমার বইয়ের প্রচারে যা আবিষ্কার করেছি এবং আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজের মত রাজনীতিকরা যার মাঝে নিজেদের আবিষ্কার করেছেন, সেটা হচ্ছে সম্পদ ও দারিদ্র্য, অভিগমন ও ক্ষমতাকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি ফালতু বয়ানের প্রতি ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ; ওটা সম্পূর্ণ ভুল ও প্রতারণাপূর্ণ এবং ওটা ধ্বসে পড়ছে। দ্বিতীয় আরেকটি বয়ান হচ্ছে পৃথিবী কীভাবে ভালো থেকে আরো ভালো হচ্ছেঃ ভারত ও চীন এবং অন্যান্য জায়গার মানুষ দারিদ্র্য থেকে নিষ্কৃতি পাচ্ছে এবং পৃথিবী এখন তার শ্রেষ্ঠ অবস্থায় আছে। এটা মনে না করলেও চলবে যে আমরা লোভের দ্বারা উৎসারিত জলবায়ু পরিবর্তন থেকে সম্ভবত ৫০ বছর দূরে আছি। সে বয়ানটিও এখন পর্যন্ত সংবাদ মাধ্যমে ও সংস্কৃতিতে, বামপন্থীদের মধ্যেও, সহজেই সওয়ার হয়েছে। আর তারপরে বিলিয়নিয়ার ও কোম্পানিগুলোর একটি সর্বশেষ বয়ান আছে — যতক্ষণ তারা ভালো কাজ করছে ততক্ষণ তারা আর কী করছে সেটা আমরা জানতে চাই না, তারা যতক্ষণ দিতে থাকে ততক্ষণ আমরা জানতে চাই না তারা কীভাবে তাদের বিত্ত গড়ে তোলে। এটি একটি মাফিয়া কারবারের মতঃ কোনো প্রশ্ন করা হয় না।

রুটগার: আমি একমত। আমি মনে করি, বাম ও ডান উভয় দিকের রাজনীতিকরা দীর্ঘ সময় যাবত বিশ্বাস করেছেন যে অধিকাংশ সম্পদই উঁচু তলায় সৃষ্টি হয়েছে। বুদ্ধিদীপ্ত উদ্যোগপতি, দূরদর্শীরা কর্মসংস্থান তৈরি করে। ডানপন্থীরা বলে আমাদের প্রয়োজন তাদেরকে পৃথিবীর সকল স্বাধীনতা দেওয়া, ধনীদের সম্পদ বাড়লে গরীবদেরও সম্পদ বাড়বে এবং সবকিছুই ঠিক হয়ে যাবে। উইনি দাভোসে যেটা খুব ভালো করে দেখিয়েছেন তা হলো বেশিরভাগ সত্যিকারের সম্পদ শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্তদের দ্বারা আদতে নিচের দিকে তৈরি হয় এবং উঁচু তলায় সম্পদের ব্যাপক ধ্বংস ও শোষণ হয়। উদ্যোক্তারা উদ্যোক্তাসুলভ মানসিকতা ও কঠোর পরিশ্রমের ভাষা ব্যবহার করে থাকতে পারেন, কিন্তু আপনি যদি সত্যিকার অর্থে তাদের ব্যবসায় মডেলের গভীরে অবগাহন করেন তাহলে দেখবেন যে সর্বজনহিতে তাদের কোনো অবদান নেই। তারা যা সৃষ্টি করে তার চেয়ে বেশি ধ্বংস করছে।

আনন্দ: বিলিয়নিয়াররা কীভাবে এটা শুরু করলো? কীভাবে এমনটা ঘটলো যে তারা আইডিয়ার জগতকে এত সফলতার সাথে জয় করে ফেললো এবং সামনের বছরগুলোতে ধারণার যুদ্ধে জয়লাভ করার জন্য আমাদের কী করণীয় আছে বলে আপনি মনে করেন?

উইনি: মার্গারেট থ্যাচার যখন ইউনিয়নসমূহকে দমন করার জন্য সচেষ্ট হয়েছেন তখন আমি যুক্তরাজ্যে ছাত্রী ছিলাম। সে সময়ের একটি নতুন ভাষা ছিলোঃ বার্তাটি ছিলো আপনি যদি দরিদ্র হন তাহলে আপনি যথেষ্ট কঠোর পরিশ্রম করছেন না। আপনাকে জয়ী হতেই হতো এবং যদি আপনি তা না হতেন তাহলে সেটা ছিলো আপনার দোষ। সাধারণ শ্রমজীবী মানুষকে রক্ষণশীল করা হয়েছিলো। তবে এখন এমন মানুষ কদাচিৎ দেখা যায় যারা নিজেদেরকে শীর্ষে দেখতে পায়। শীর্ষে আছে এমন গুটিকয় খুবই ধনী লোক, যা অবিশ্বাস্য। তাই সাধারণ মানুষ বলছে, “একটু দাঁড়াও, আমরাই সংখ্যাগুরুর দলে এবং আমাদের জীবন সেরকম নয়।”

“মানবতাবাদ শুধু বাম ধারার লোকদের জন্য নয়। এটা তাদের জন্য যারা প্রাইভেট জেট-সেটের ভণ্ডামির দ্বারা মানসিকভাবে প্ররোচিত হতে চায় না।”
আনন্দ গিরিধারাদাস

রুটগার: লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্সের গবেষকদের একটি হতাশাচ্ছন্ন উদ্ঘাটন আছেঃ ১৯৮০ এর দশক থেকে ২৩টি পশ্চিমা দেশের জরিপে দেখা গেছে, তারা যত বেশি অসমতার দিকে ঝুঁকেছে ততই মানুষ আদতে  আরো বেশি করে বিশ্বাস করেছে যে শীর্ষে থাকা লোকেরা সেখানে আছে কারণ তারা সর্বাধিক পরিশ্রম করেছে।

আনন্দ: আমি মনে করি অনেক ক্ষেত্রেই আইডিয়ার অনুশীলনের তাৎপর্য অনুধাবনের বেলায় প্রগতিশীলদের চেয়ে ধনিকতন্ত্র ও রক্ষণশীলতার শক্তি বেশি ভালো। আর আইডিয়ার একটি বড় অংশ হচ্ছে ভাষা। আমি ভাষার জয়ের কয়েকটি উদাহরণ দিতে চাই — যেসব শব্দ শুধু ধনিক শ্রেণীই নয়, বরং সবাই ব্যবহার করে, তবে সেটা ধনিকদের স্বার্থে পর্যবসিত হয়। একটা হচ্ছে “উইন-উইন।” এ শব্দটা দারুণ শোনায়। উইন-উইনের বিপক্ষে কে যাবে? তবে, প্রকৃতপক্ষে, একমাত্র আকাঙ্ক্ষিত প্রগতি হচ্ছে সেটি যা বিজয়ীদেরকে জয়ী করার পাশাপাশি হয়ত অন্যদেরকেও ক্ষমতায়িত করে, এমন ইঙ্গিত দেওয়ার একটি অস্পষ্ট শক্তিশালী উপায়ই হচ্ছে উইন-উইন।  

উইনি: আমাদের বলা হয়েছিলো বিশ্বায়ন সবার জন্য লাভজনক। এটি এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে সবাই জয়ী এবং কেউই পরাজিত নয়। আমেরিকায় কেউই নিজেদেরকে শ্রমিক শ্রেণী বলে পরিচয় দিতে চায় না। তারা মধ্যবিত্ত শ্রেণী হিসেবে অভিহিত হতে চায়। মানুষ মনে করে যে বিজয়ীদের সাথে নিজেদের শনাক্ত করা সঠিক কাজ আর এটাই অনেক সমস্যাকে আড়াল করে।  

আনন্দ: আরো কয়েকটি উদাহরণ দেই। “কর্তৃত্বসম্পন্ন নেতা”র কথা ধরা যাক। আপনারা দুজন যখন দাভোসে ছিলেন, তখন আপনারা কর্তৃত্বসম্পন্ন নেতৃবৃন্দ দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিলেন যারা সত্যিকার অর্থে যা বিশ্বাস করেন আদতে সেটা বলেন নাঃ তারা এমন মানুষ যারা ক্ষমতাবানদের সম্বন্ধে ভালো কথা বলেন এবং আমন্ত্রিত হতে থাকেন। আপনারা দু’জনে যে কারণে আলোড়ন তুলেছেন তা হলো আপনারা কর্তৃত্বসম্পন্ন নেতা হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, আপনারা চিন্তাবিদের মত আচরণ করেছেন, যেটা সেসব মানুষ আশা করে না। আরেকটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে “ভালো করার মাধ্যমে উন্নতি করা”ঃ এটা আশাব্যঞ্জক শোনায় কিন্তু এর অর্থ হচ্ছে যেসব মানুষ পয়সা-কড়ি বানাচ্ছে, তাদেরকে সেই অচলাবস্থা পরিবর্তনের কাজে লাগানো, যেটার পরিবর্তন সাধনে তাদের কোনো আগ্রহই নেই। আর তারপর আছে “সোশ্যাল ইমপ্যাক্ট” (social impact) ও “সোশ্যাল ভেঞ্চার ক্যাপিটাল” (social venture capital) এবং “ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টিং” (impact investing) এর মতো কিছু শব্দ। এগুলো হচ্ছে “ক্ষমতা” ও “ন্যায়বিচার” এবং “মর্যাদা”-র মত শব্দগুলোকে ব্যবহার করতে নিরুৎসাহিত করার তরিকা। এগুলো হচ্ছে ইউনিয়ন ও কর নিয়ে আমাদেরকে কথা বলতে না দেওয়ার একটি প্রয়াস।  

উইনি: আমি ২০০৭ কিংবা ২০০৮ সাল থেকে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আলোচনায় অংশ নিচ্ছি, আর আমি যে কারণে সবসময় হতাশ হই, সেটা হচ্ছে আপনি “জলবায়ু ন্যায়বিচার” শব্দটি ব্যবহার করতে পারবেন না। আপনি “জলবায়ু পরিবর্তন” নিয়ে কথা বলতে পারবেন, কিন্তু আপনি বলতে পারবেন না এটি একটি অবিচার, যদিও যারা এর শোচনীয় পরিণামের সম্মুখীন হচ্ছে তারা দরিদ্র মানুষ। আর তাদের কারণে এটা ঘটেনি। আলোচকরা “জলবায়ু কার্যক্রম” এবং আমাদের সবাইকে মিলে তা করতে হবে এমন ধারণা, এমন সুন্দর সুন্দর কথাকে সামনে নিয়ে আসেন। যেখানে দায়বদ্ধতা থাকা দরকার সেখানে আমরা সেটাকে তুলে ধরি না।

উইন-উইনার্স…বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম, দাভোস, সুইৎজারল্যান্ড আলোকচিত্রঃ মাইকেল ইউলার / এপি

রুটগার: আমার কাছে আসলেই আইডিয়ার গুরুত্ব, বিশেষ করে অধিকারের গুরুত্ব নিয়ে আপনার পয়েন্ট ভালো লাগলো। মানুষ প্রায়ই থ্যাচার অথবা রোনাল্ড রিগ্যানের দিকে আলোকপাত করে, কিন্তু আমরা প্রায়ই যেটা ভুলে যাই তা হলো নব্য-উদারপন্থা বলে পরিচিত বস্তুটি আদতে শুরু হয়েছিলো ১৯৫০ এর দশকে। মিল্টন ফ্রিডম্যান ও ফ্রিডরিখ হায়েকের মত ব্যক্তিবর্গ প্রভাবশালী থিংক ট্যাঙ্ক মন্ট পেলেরিন সোসাইটির অংশ হিসেবে সমবেত হয়েছিলেন এবং সে সময় তারাই ছিলেন সত্যিকারের রেডিক্যাল; প্রায় অন্য সকলেই ছিলো সমাজতন্ত্রী নয়ত সোশ্যাল ডেমোক্রেট। অতএব তারা ভাবলেন যে, আমাদেরকে আইডিয়ার বিকাশ সাধন করতে হবে। আমরাই এখন প্রতিরোধের শক্তি, আমাদের এখন প্রতিষ্ঠান তৈরি করা, নতুন বয়ানের উন্নতিসাধন এবং  চলমান ব্যবস্থা ধ্বসে পড়া পর্যন্ত — কিংবা নিদেনপক্ষে যখন একেবারেই কাজ করবে না ততক্ষণ ধৈর্য্যধারণ করা দরকার। ১৯৭০ এর দশকে তেল সংকট, মুদ্রাস্ফীতি, পাশ্চাত্যে শ্রমিকদের ধর্মঘটের ফলে ঠিক এটাই হয়েছিলো। আরো বেশি মানুষ ভাবতে শুরু করলো যে, এ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কাজ করছে না। আর তখনই আপাতদৃষ্টিতে নতুন সেসব আইডিয়াকে থ্যাচার ও রিগ্যান মঞ্চে নিয়ে এলেন যেটা আদতে ত্রিশ বছর ধরে বিকশিত হয়েছিলো।

২০০৮ সালের অর্থনৈতিক ধ্বসের পর যখন এটা পরিষ্কার হয়ে গেলো যে নব্য-উদারপন্থা বিপুল পরিমাণ ফালতু জিনিসের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত, তখন সমস্যা ছিলো যে এর কোনো বিকল্প আছে বলে মনে হয়নি। বামপন্থীরা অনেক কিছুর বিরুদ্ধে ছিলোঃ ব্যয় সংকোচন; সমকামভীতি; বর্ণবাদ; প্রতিষ্ঠান। কিন্তু আপনার জানতে হবে আপনি কীসের পক্ষে  আছেন। কয়েক বছর আগে আমি বলেছিলাম যে আমাদের প্রগতিশীলদের একটি মন্ট পেলেরিন থাকা দরকার, এমন সব আইডিয়ার উন্নয়ন শুরু করা প্রয়োজন যেগুলো এখন একদমই কল্পনারাজ্য মনে হলেও ভবিষ্যতে বাস্তবতায় পরিণত হতে পারে। আমি তখন আশা করিনি যে আমি মৌলিক আয় নিয়ে কথা বলার জন্য সকল জায়গার মধ্যে দাভোসেই আমন্ত্রিত হবো, কিংবা কর নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার কারণে আমি ভাইরাল হয়ে যাবো। এটা সত্যিই চমকপ্রদ যে ব্যাপারগুলো কীভাবে দ্রুত বদলে গেছে।

তথাপি, অতীত প্রসঙ্গে বলতে গেলে, ঠাণ্ডা যুদ্ধের গুরুত্ব আছেঃ পুঁজিবাদ বনাম কমিউনিজম। আমি প্রায়শই ভাবতাম সোশ্যাল ডেমোক্রেটরা এক অর্থে আরো বাম দিকে কমিউনিজমে পরিণত হওয়ার উপর  নির্ভর করে থাকে। তারপর, সেই কমিউনিজমের পরাজয়ের পর ও ১৯৮৯ সালে বার্লিন দেয়ালের পতনের সাথে সাথে “ইতিহাসের সমাপ্তি” ঘোষিত হয়েছিলো এবং রাজনীতি শুধুই কৌশলবিদ্যায় পরিণত হচ্ছিলো — উইন-উইন। এখন যেটা ঘটে চলেছে তা হলো একটি নতুন প্রজন্ম আছে যারা ঠাণ্ডা যুদ্ধের দ্বারা মানসিকভাবে ত্রস্ত নয়। আমি এটা দাভোসেও শুনেছিঃ আপনি কর নিয়ে বলতে গেলে কতিপয় বিলিয়নিয়ার বলে, “এটা ভেনেজুয়েলার মত শোনায়”– মাইকেল ব্লুমবার্গ সম্প্রতি এটা বলেছেন। কিন্তু এখনকার নতুন প্রজন্ম বলে, “আমাদের কী?”

আনন্দ: গত পাঁচ মাসে আমার বুক ট্যুরে আমি যত মানুষের সাথে দেখা করেছি, এর আগে আমি তত মানুষের সাথে দেখা করিনি। আর যে জিনিসটি আমি দেখেছি তা হলো কথাবার্তা এখন পুঁজিবাদ বনাম গুলাগ-কে কেন্দ্র করে হয় না। দাভোসে বিল গেটসকে যখন আমার বইটি নিয়ে জিজ্ঞাসা করা হয় তখন তিনি ইঙ্গিত দিতে চেয়েছেন যে আমি একজন কমিউনিস্ট, যদিও তিনি এক বছর আগেই এটা বলেছেন। আমি মনে করি অধিকাংশ মানুষ এখন উপলব্ধি করেছে যে এই “কোনো বিকল্প নেই” একটি বাজে কথা। একটি বোঝাপড়া গড়ে উঠছে যে এটা এখন আর ডান বনাম বাম কিংবা কমিউনিজম বনাম পুঁজিবাদ নয়, বরং মানবতাবাদ বনাম ধনিকতন্ত্র।

আমার মনে হয় আমাদের সত্যিই মানবতাবাদের এ পরম্পরাকে ধারণ করা দরকার কারণ এটা কেবল বাম ধারার লোকদের জন্য নয়। এটা সবার জন্য যারা প্রাইভেট জেট সেটের (আন্তর্জাতিকভাবে সম্পদশালী এক দল লোক যারা জেট প্লেনে চড়ে বিশ্ব ভ্রমণ করে সেসব সামাজিক কার্যক্রমে অংশ নিতো, যেগুলো থেকে সাধারণ মানুষ বঞ্চিত)। ভণ্ডামির দ্বারা মানসিকভাবে প্ররোচিত হতে চায় না। আমি সত্যিই আঁচ করতে পারি, এমনকি ডান ধারার লোকদের মধ্যেও একাধিপত্য, রাজনৈতিক দুর্নীতি এবং সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যকার পারস্পরিক পুঁজিবাদের প্রতি ক্ষোভ আছে। যেসব কোম্পানি কমিউনিটির অংশ হবার ব্যাপারে ফাঁপা বুলি আঁওড়ায় কিন্তু এমন সব নিয়ামকের উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয় যাদের সাথে সেসব কমিউনিটিগুলোর আসলেই কোনো সম্পর্ক নেই, তাদের প্রতি ক্ষোভ আছে। আমরা এখনো সেই রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেখিনি যেটা শুধু বাম ধারার মানুষদের কথাই শুনবে না বরং ডানপন্থী ১০% অথবা ২০% মানুষের কথা শুনবে যারাও কিনা ধনিকতন্ত্রের বিরুদ্ধে, যদিও তারা হয়ত বাজারকে পছন্দ করে। এমন মানুষ হয়ত ব্যবসা পছন্দ করতে পারে কিংবা একদিনে তাদের চুল কাটার দোকান থেকে ১ লক্ষ পাউন্ড উপার্জনের ধারণাকে পছন্দ করতে পারে, কিন্তু তারা আমাজনকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র খুচরা বিক্রেতা হিসেবে পছন্দ করে না, তারা ফেসবুকের দ্বারা গণতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রিত হতে অথবা জাতিগত সহিংসতাকে ছাড় দিতে পছন্দ করে না।

আমাজন গুদামঘরের অভ্যন্তরে, মিল্টন কেইনেস, ইংল্যান্ড। আলোকচিত্রঃ ব্রুনো ভিনসেন্ট / গেটি

রুটগার: আমি যেটা করে আসছি তা হচ্ছে একটি ভিন্ন ধরনের ভাষা ব্যবহার করছি, যেটার কেন্দ্রস্থলে আছে সকলের জন্য সর্বজনীন ন্যূনতম আয় (basic income) এবং ধনীদের উপর অধিক কর। বাম ধারার লোকেরা অনেক সময় সহমর্মিতার ভাষা ব্যবহার করে, অথবা তারা বলে যে কিছু জিনিস শুধুই অনৈতিক নয়ত সেটা অন্যায্য। আর হ্যাঁ, গণমানুষের একটি অংশ এমন ভাষার প্রতি আগ্রহী। তবে গণমানুষের আরেকটি অংশ আদতেই এমন ভাষা পছন্দ করে না। এছাড়া গরীব মানুষ কখনো চায় না তাদের উপর খবরদারি করা হোক।

একটি ব্যাপার হচ্ছে এই উইন-উইন কথাটিকে ফিরিয়ে নিতে হবে এবং অন্য কোনো ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, দারিদ্র্য নিয়ে কিছু করা — অনেক গবেষণা দেখিয়েছে যে দারিদ্র্য বিমোচন হলো এমন একটি বিনিয়োগ যেটা নিজেই নিজেরটা পরিশোধ করতে পারে। আপনি স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়ে কম খরচ করবেন, আপনি অপরাধে কম খরচ করবেন, বাচ্চারা স্কুলে ভালো করবে, তাহলে এটি একটি উইন-উইন নীতিমালা। তাছাড়া, ইতিহাসে দেখা গেছে যে সবচেয়ে মৌলিক উদ্ভাবন এসেছে সরকারি ব্যয় থেকে। আইফোন একটি নিখুঁত দৃষ্টান্তঃ প্রত্যেকটি মৌলিক প্রযুক্তি যা আইফোন টাচস্ক্রীন, ব্যাটারি, মোবাইল প্রযুক্তির মধ্য দিয়ে গেছে — সবকটি উদ্ভাবন করেছে সরকারের বেতনভুক্ত গবেষকরা।

১৯৮০ ও ‘৯০ এর দশকে সরকারকে সহজাতভাবে অপব্যয়ী হিসেবে চিন্তা করাটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছিলো। তবে দু”জন ডাচ গবেষক একটি নতুন গবেষণা করেছেন যেখানে তাঁরা ৩৭টি দেশের ২৭,০০০ মানুষকে জিজ্ঞাসা করেছেনঃ আপনি কি আপনার কাজকে মূল্যবান মনে করেন? দেখা গেছে যে, এক-চতুর্থাংশ মানুষ মনে করে তাদের কাজ কোনো মূল্য বহন করে না। পাবলিক সেক্টরের চেয়ে প্রাইভেট সেক্টরের চারগুণ মানুষ এমনটা মনে করে। বেশি মূল্যবান চাকরি, যেমন অন্যদের যত্ন নেওয়া, পুলিশ অফিসার, অগ্নিনির্বাপণকারী, আপনি যেটাই বলেন না কেন, সবই পাবলিক সেক্টরে। অপব্যয়ী চাকরির পুরো বয়ানকে উলটে দেওয়া সম্ভব।


“অতি ধনীরা গণমানুষের কণ্ঠস্বর কিনতে, মিডিয়া কিনতে, বিচার থেকে দায়মুক্তি কিনতে তাদের টাকা ব্যবহার করে।”
উইনি বিয়ানিমা

উইনি: হ্যাঁ, অক্সফামে আমরা এটাকে মানব অর্থনীতি বলি, এবং এটা কেমন হতে পারে সেই চিত্রটি  আঁকার চেষ্টা করি। এখন কী ভুল হচ্ছে সেটা নিয়ে শুরু করি আমরা, অতি ধনীরা শুধু অমূল্য চিত্রকর্ম কিনতে খরচ করে না, বরং গণমানুষের কণ্ঠস্বর কিনতে, মিডিয়া কিনতে, বিচার থেকে দায়মুক্তি কিনতে, নীতিমালা প্রক্রিয়া কিনতে, কংগ্রেম্যান ও কংগ্রেস-ওম্যানদের কিনতে সেই টাকা ব্যবহার করে। আমি একে বলি ঘুষ দেওয়া, ওরা একে বলে তদবির করা। আমরা দেখাই যে শীর্ষস্থানে গচ্ছিত সম্পদ আপনার কণ্ঠস্বর, আপনার অধিকার, যেসব নীতিমালা আপনার পক্ষে কাজ করতো সেগুলোকে ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। আমি দেখেছি এটা মানুষকে অবাক করে — তারা ভাবতে শুরু করে যে ধনীরা তাদের টাকা দিয়ে মজা করছে, কোকেইন সেবন করছে। তারপর তারা আদতেই উপলব্ধি করে যে, তারা সাধারণ মানুষকে ক্ষমতাহীন করতে ওই টাকা ব্যবহার করে। উদারহরণস্বরূপ, বিলিয়নিয়ারদের কর ফাঁকি দেওয়ার ফলে সরকার যে পরিমাণ টাকা থেকে বঞ্চিত হয় তাকে আমরা নার্সদের সংখ্যার পরিভাষায় প্রকাশ করতে পারি। ধরুন আমরা বলেছিঃ “অমুক বিলিয়নিয়ার প্রায় ৫০,০০০ নার্সকে ফাঁকি দিয়েছে।” আমরা সে ধরনের ভাষা ব্যবহার করি — এটা আবেগময়, মানুষের উপর এর প্রভাব আছে।

আনন্দ: আপনি যে ধরনের আবেগময় ভাষার কথা বললেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডানপন্থীরা সেটাকে আরো  ভালোভাবে ব্যবহার করে আসছে। উদাহরণস্বরূপ, এস্টেট করের যেকোনো সংস্করণ শীর্ষে থাকা মানুষের  খুব অল্প সংখ্যক এস্টেটের উপর প্রভাব ফেলেঃ এটাকে বিচক্ষণতার সাথে মৃত্যু কর হিসেবে পুনরায় মোড়কাবৃত করা হয়েছে। আপনি যদি এটাকে মৃত্যু কর হিসেবে অভিহিত করেন তাহলে মানুষের এই অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে পারেন যে সরকার তাদের মরণশীলতার উপর হস্তক্ষেপ করছে। যেসব মানুষ আরো সমতা ও আরো ন্যায়বিচার চায়, তাদেরকে ভাষার ব্যাপারে আরো সৃষ্টিশীল হওয়া দরকার।

রুটগার: একটি ধারণা হলোঃ আমার মতে একে আলস্য কর বলা উচিত। এটা আসলেই তাই। বিপুল শ্রেণির মানুষ সত্যিকার অর্থে নিজেরা কোনো আসল কাজ করেনি অথবা সমাজে কোনো অর্থপূর্ণ অবদান রাখেনি। তারা নির্দিষ্ট কিছু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছে। আমিও মৌলিক আয়কে কাজের সপক্ষে দেখানোর চেষ্টা করছি। সিলিকন ভ্যালির ভাষায় বললে এটি “মানুষের জন্য ভেঞ্চার ক্যাপিটালিজম।” সবাই ভিন্ন পছন্দ বেছে নিতে চায়, একটি ভিন্ন শহরে গিয়ে একটি নতুন কোম্পানি শুরু করতে চাওয়ার সক্ষমতা চায়। আমি বাম বনাম ডান অক্ষকে অপছন্দ করি, কিন্তু আপনি অনেক সময় একে অতিক্রম করতে পারেন না।

আনন্দ: আমি কয়েক সপ্তাহে আগে একটি চার্চে মার্টিন লুথার কিং দিবস উপলক্ষে আমেরিকান লেখক তা-নেহিসি কোটসের সাথে আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজের একটি অসাধারণ আলোচনা শুনছিলাম। ওকাসিও-কর্তেজ বললেন, তাঁর মতো নির্বাচিত কর্মকর্তারা যত না নেতা তার চেয়ে বেশি অনুসরণকারী। তিনি বলেন: “নির্বাচিত সরকারি কার্যালয়ের কাজের একটি অংশ হচ্ছে গণমানুষের ইচ্ছাকে দেশের আইনে অনূদিত করা। গণমানুষের সেই ইচ্ছাকে কারা রূপ দেয়, কারা চালিত করে এবং কারা উত্থাপন করে? লেখক, সাংবাদিক, এক্টিভিস্ট, শিল্পী।” আর এটা খুবই সত্য। কসাইখানাগুলো আসলে কেমন ছিলো এবং শ্রম পরিবেশ আসলে কেমন ছিলো সেটা দেখানোই ছিলো আপটন সিনক্লেয়ারের কাজ, আর তারপর রাজনীতিবিদরা এগুলোর উন্নতিসাধনের জন্য আইন তৈরি করেছেন। তাদের সৃষ্ট ধনিকশ্রেণী ও একচেটিয়া পৃথিবীর দরুণ সাংবাদিকতা, বই ও অন্যান্য অনেক কিছুর জন্য এটা একটা ভয়ানক সময়। আমি এই কথোপকথন থেকে বর্তমান সময়ে ধারণা ও বইয়ের শক্তি সম্বন্ধে আশাবাদী। যেসকল এক্টিভিস্ট, শিল্পী ও লেখক সততাপূর্ণ কথা বলার মাধ্যমে মানুষের ঈপ্সিত বস্তুকে বদলে দিচ্ছেন, তাদের দ্বারা সংঘটিত এসব ইস্যুর প্রেক্ষিতে আমার মনে হচ্ছে আমরা একটি তাৎপর্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক বাঁক দেখতে পাচ্ছি।

আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজ, নিউ ইয়র্কের ব্রংক্স ও কুইন্সের ডেমোক্রেটিক প্রতিনিধি। আলোকচিত্র: ইপিএ / এরিক এস লেসার  

উইনি: আমার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হচ্ছে গল্প। অক্সফাম বিশ্বের ৯০টি দেশে কাজ করে, এবং মানুষ খুব জোরালোভাবে গল্পগুলোর প্রতি সাড়া দেয়।

রুটগার: আমার বয়স ৩০ বছর। আমি এখন সাত কিংবা আট বছর যাবত লিখছি। আগে আমার কখনো এমন দৃঢ় অনুভূতি ছিলো না যে যুগভাবনা সত্যিই বদলে যাচ্ছে এবং এখন আপনি এমন সব বিষয় নিয়ে কথা বলতে পারেন যেগুলো মাত্র কয়েক বছর আগেও একেবারেই সম্ভব ছিলো না। মনে হচ্ছে রাজনৈতিকভাবে যা সম্ভব সেটার জানালা খুলে যাচ্ছে, অথবা আমরা যেটাকে ‘ওভারটন উইন্ডো’ বলি, সেটা বদলে যাচ্ছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জোসেফ ওভারটন কর্তৃক উদ্ভূত তত্ত্ব অনুযায়ী আইডিয়াসমূহ একটি নির্দিষ্ট সৃষ্টিশীল সময়ে কোনো একভাবে আলোচনা করার জন্য গ্রহণযোগ্য হয়, এবং এই জানালাটি স্থানান্তর করাই হলো আসল রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। এমন স্থানান্তরের নেপথ্যের মানুষরা কখনো রাজনীতিবিদ অথবা মূলধারার লেখক হয় না, তারা রেডিক্যাল — যাদেরকে প্রায়ই অকৃত্রিম বা অদ্ভূত হিসেবে দেখা হয়, যেসব মানুষ আপনাকে অস্বস্তিকর ও রাগান্বিত করে তোলে। আর এই কঠিন কাজ করার কারণে তাদেরকে অনেক সময় চড়া মূল্য দিতে হয়। ইতিহাস জুড়ে অনেক দৃষ্টান্ত আছে, আমরা দাসপ্রথার বিরুদ্ধে লড়াই, অথবা ভোটাধিকারের জন্য সংগ্রাম করা নারী, অথবা কল্যাণ রাষ্ট্রসমূহের প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি যাই বলি না কেন। যেসব ধারণাকে হাস্যস্পদ অথবা খুব দামী কিংবা বিপজ্জনক হিসেবে খারিজ করা হয়েছিলো, সেগুলোই সভ্যতার ভিত্তিপ্রস্তরে পরিণত হয়েছে।

উইনি: আমি আশা করি এটা সত্য।

আনন্দ: আমি মনে করি প্রত্যাশা একদম সঠিক শব্দ, কারণ আশাবাদ শব্দটি আমি কখনো পছন্দ করিনি।

আশাবাদ আপনাকে এই অনুভূতি দেয় যে, “সবকিছুই ঠিক হয়ে যাবে, শুধু বসে যাও, যাত্রা উপভোগ করো — সব ট্রেনই ভালো।” কিন্তু প্রত্যাশা মৌলিকভাবে ভিন্ন, আরেকটি পৃথিবী সম্ভব হলেও অবধারিত নয়।

উইনি: আপনি কি মনে করেন বর্ণবাদীরা, নারীবিদ্বেষীরা মনে করে যে তাদেরকে প্রতিরোধ করা হচ্ছে নাকি তারা মনে করে যে তারা নিজেদেরকে জাহির করতে এবং তাদের বাস্তবতাকে প্রথাসিদ্ধ আচরণ হিসেবে তৈরি করতে পারে?

আনন্দ: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমি যা দেখি এবং বাজি ধরে বলতে পারি নির্দিষ্ট পরিসরে ব্রিটেনেও এটি সত্য, তা হচ্ছে অনেক শ্বেতাঙ্গ শ্রমিক শ্রেণীর কমিউনিটির সাথে দুটি বড় ব্যাপার ঘটছে। এক দিকে তারা বিগত প্রজন্মের অন্য সকলের মতই উঁচু তলার বৃহৎ চৌর্যবৃত্তির শিকার হয়েছে। এটি এত দূর গড়িয়েছে যে, তারা ভাবছে যে তাদের চাইতে ভালো জীবন যাপন করবে এমন সন্তান তারা লালন-পালন করতে পারবে না, তারা এমন শিক্ষা অর্জন করতে পারবে না যা তাদেরকে এক চিলতে স্বপ্ন উপহার দেবে, তারা এমন স্বাস্থ্যসেবা পাবে না যা সর্বক্ষণ তাদেরকে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে চিন্তায় ফেলবে না, তারা সেই প্রতারণা অনুধাবন করতে পারে।

মুশকিল হচ্ছে সে সকল মানুষ আরেকটি প্রতারণা টের পায় যেটা আসলে প্রতারণা নয়, সেটা হচ্ছে নারী ও সংখ্যালঘুদের, এবং অভিবাসী ও আফ্রিকান আমেরিকানদের উত্থান। বস্তুত, এটা একদমই কোনো প্রতারণা নয়; এটি বর্ধিষ্ণু সমতার জোয়ার; এটি ন্যায়বিচার। তবে আমার মতে আমাদের এটি স্বীকার করা উচিত যে, এই পরিবর্তনের মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতাও প্রতারণা বলে অনুভূত হতে পারে। সত্যিকারের প্রতারণা থেকে যে বেদনার জন্ম নিয়েছে তার ফায়দা নিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রতারণা নয় এমন জিনিসের উপর দোষ চাপিয়েছেন। তিনি অন্যদের সাংস্কৃতিক অভ্যুত্থান সম্বন্ধে এমনটা বলেছেন — তারাই আপনার স্বপ্নকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে।

ক্ষমতাবানদের প্রতি বিক্ষুব্ধ হতে মানুষকে উৎসাহিত করার বদলে তিনি নারী ও সংখ্যালঘু এবং অন্যান্যদের প্রতি তাদেরকে বিক্ষুব্ধ হতে উৎসাহিত করেছেন। আমি মনে করি আমাদের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সেসব কমিউনিটির কাছে গিয়ে কূটকৌশল না করে, বরং ভবিষ্যৎ উদ্বিগ্নতার অনুভূতি নিয়ে সেসব অভিজ্ঞতা এবং সেটা সংঘটিত হওয়ার আসল কারণ উদ্ঘাটনের ব্যাপারে  বাধ্যগতভাবে আলাপ করা।


“মানুষ কী ধরনের দেশে বসবাস করতে চায় তা জানতে চাইলে প্রায় সবাই বলে: ‘সুইডেনের মত কোথাও।’”- রুটগার ব্রেগম্যান

এখন, যাবার আগে, আমি দেখতে চাই আমরা তিনজন আশান্বিত হতে পারি কিনা। আমরা তিনজনই একটি নির্দিষ্ট পাথরকে একটি পাহাড়ের উপরের দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছি, আর আচমকাই ঢাল আরো সুগম হচ্ছে। আপনি কী দেখতে চান?

রুটগার: আপনি যদি দুনিয়াজুড়ে মানুষকে জিজ্ঞেস করেন তারা কী ধরনের দেশে বসবাস করতে চান, তাহলে প্রায় সবার উত্তর হবেঃ “সুইডেনের মত কোথাও।” কম অসমতা, শ্রমিকদের বেশি অধিকার, ধনীদের উপর বেশি কর, আপনি বাম কিংবা ডান ধারার মানুষকে জিজ্ঞেস করেন না কেন এতে কিছু এসে যায় না, এটা মোটামুটি সর্বত্রই এক রকম। অতএব বিপুল সম্ভাবনা আছে। আপনাকে শুধু সেই রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে আসার পথ খুঁজতে হবে। ২০১৬ সালে বার্নি স্যান্ডার্সের টুগেদার নামক একটি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন আমার সত্যিই পছন্দ হয়েছিলো। সেখানে তিনি বলেন, “তারা আমাদেরকে সংজ্ঞায়িত করবে সেটা আমাদের করতে দেওয়া উচিত নয়।” প্রচারাভিযানের পুরো উদ্দেশ্যই ছিলো মানুষকে এক কাতারে নিয়ে আসা — কৃষ্ণাঙ্গ, শ্বেতাঙ্গ, পুরুষ, নারী, যাই হোক। আমার মতে, খুব সহজ বার্তা হচ্ছে যে আমাদেরকে যোগাযোগ স্থাপন করে যেতে হবেঃ ওদের মাধ্যমে আমাদেরকে বিভক্ত হতে দিও না।   

উইনি: আমাদের অবশ্যই বাইরে বেরোতে হবে ও জনসংযোগ করতে হবে এবং নতুন প্রথাসিদ্ধ আচরণ সৃষ্টি করতে হবে, যেমন মানুষ যখন অসুস্থ হয় তখন সহযোগিতা না পাওয়া অনুচিত, তাদের বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া উচিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ধারণাটি জীবিত ছিলো। সারা পৃথিবীর সবাই বুঝেছিলো ও একাত্ম হয়েছিলো যে, স্বাস্থ্যসেবা হওয়া উচিত একটি অধিকার। যে অল্প সংখ্যক লোক সম্পদ ও ক্ষমতা কুক্ষিগত করছে তাদের প্রতি, এসমস্ত একাধিপত্যের প্রতি, এসমস্ত বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানি তাদের কর না দিয়ে আমাদের তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে তাদের প্রতি ক্ষোভের ব্যাপারে আমি আশাবাদী। শীর্ষস্থানে থাকা অল্প কিছু লোকের কাছে এত বিপুল সম্পদ ও অবিচারের সমাবেশ। সেটাই আমাদেরকে সাহায্য করবে সমাজের জন্য যা ভালো তার অভিমুখে আদর্শকে স্থানান্তর করতে, যে মানব অর্থনীতি সবার জন্য কাজ করবে, এর মধ্যে তারাও আছে যারা হয়ত কাজ ও উপার্জন করতে সক্ষম নয়। বর্তমানে আমরা একটি আন্দোলনে রূপ নিচ্ছি।

আনন্দ: আমি দারুণভাবে আশান্বিত, যেটা অদ্ভূত কারণ আমার দেশে এযাবতকালের সবচেয়ে ভয়ংকর নেতা আছেন এবং দুনিয়াজুড়ে খুব ফাটল দেখা যাচ্ছে। আমি সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিটেনে হাউজ অফ কমনসে ছিলাম যার কয়েক সপ্তাহ আগে [ব্রেক্সিটের উপর] সেই বিশৃঙ্খল ভোটের আয়োজন করেছিলো, তাই আশাবাদী হওয়াটা অদ্ভূত মনে হতে পারে। তবে ইতিহাসের চক্র আছে এবং আমি বিশ্বাস করি আমরা ৪০ বছরের চক্রের স্বাভাবিক সমাপ্তিতে আছি , যেটা টাকার ধর্ম দ্বারা নির্ধারিত, যেটা উদ্যোগপতি ও বাজারের শ্রদ্ধা দ্বারা নির্ধারিত। আর শুধুমাত্র “ওটা ভুল” বলার চেয়ে, আমি মনে করি সমাজ হিসেবে আমাদের এটা বলা বেশি সহানুভূতিসম্পন্ন হবে যে বিগত ৪০ বছর ছিলো একটি নিরীক্ষা, যে যুগ উদ্যোগপতিদেরকে বীর হিসেবে, বাজারকে ঈশ্বর হিসেবে নির্ধারিত করেছে — মাত্র এক শতাব্দী পূর্বে ছিলো শিল্প বিপ্লব ও প্রথম সোনালী যুগ, এক বিরাট প্রতিপত্তির সময়। আমার মতে, আমরা এমন একটি যুগের মরণ দশায় বাস করছি যেটা অসাধারণ ভালো কাজ করেছে, তবে নিদারুণ ক্ষতিও করেছে, যেটা বিশাল সংখ্যক মানুষকে দারিদ্র্য থেকে তুলে এনেছে, তবে এ গ্রহকে অন্তিম বিপদে পতিত করেছে। আর আমি আশা করি যে, এ যুগের পর আরেকটি যুগের আগমন ঘটবে কারণ এভাবেই ইতিহাস ক্রিয়াশীল থাকে। মরণদশার পাশাপাশি এখন জন্মদশাও আছে। আমি বিশ্বাস করি বাজারের যুগের পর আসবে সংস্কারের যুগ ও সংহতির যুগ।

____________________________

১   সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের শ্রম শিবির ব্যবস্থার দায়িত্বে থাকা সরকারি সংস্থা। গুলাগে আটককৃত অপরাধী ও রাজবন্দীদের কাজের বিনিময়ে অর্থ প্রদান করা হতো। প্রথম সোভিয়েত রাষ্ট্রপ্রধান ভ্লাদিমির লেনিনের সময় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তীতে জোসেফ স্টালিনের আমলে ১৯৩০ থেকে ১৯৫০ এর দশকের প্রথম ভাগ অবধি এ ব্যবস্থা অব্যাহত ছিলো।

২   কোনো ব্যক্তি উত্তরাধিকার সূত্রে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি লাভ করলে সেই সম্পদের মূল্যমান যদি আইন দ্বারা নির্ধারিত তার রেয়াত  সীমার চেয়ে বেশি হয়, তখন সে সম্পদের উপর ধার্যকৃত করকে এস্টেট কর বলে। উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্ত সম্পদের উপর মূলত এস্টেট কর ধার্য করা হয়, কিন্তু জীবিত স্বামী/স্ত্রীর কাছে সম্পত্তি হস্তান্তরের বেলায় এটি প্রযোজ্য নয়। উত্তরাধিকারীদের কাছে সম্পদ হস্তান্তরের পূর্বে এস্টেট করা আরোপ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে, সন্তানরা পিতা-মাতার নিকট থেকে সম্পত্তি লাভ করলে সেটার উপর কর আরোপ করা হয় না।     
আনন্দ গিরিধারাদাসের উইনারস্‌ টেইক অলঃ দ্য এলিট শারাড অফ চেঞ্জিং দ্য ওয়ার্ল্ড  প্রকাশিত হয়েছে এলেন লেন থেকে। ব্লুমসবেরি থেকে প্রকাশিত হয়েছে রুটগার ব্রেগম্যানের ইউটোপিয়া ফর রিয়ালিস্টস্‌। উইনি বিয়ানিমা অক্সফাম ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী পরিচালক।    

‘দ্য গার্ডিয়ান’ থেকে অনুবাদ করেছেন: ইমন রায়

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!