বিশ্ববিদ্যালয়ের অধঃপতনে শিক্ষকদের দায়বদ্ধতা

Reading Time: 3 minutes

প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাণ কেন্দ্র। একটি সুন্দর, শিক্ষিত জাতি গঠনে অসামান্য অবদান রেখে চলেছে প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে। তবে মাঝে মাঝেই শিক্ষায় পূর্বের ঐতিহ্য, শিক্ষকদের দায়িত্বে অবহেলা এবং শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে নেতিবাচক পদক্ষেপ লক্ষ করা যায়, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত পরিতাপের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা এবং এক্ষেত্রে শিক্ষকদের অনাগ্রহ নিয়ে সম্প্রতি ফেসবুকে একটি পোস্ট করেন জনাব রুশাদ ফরিদী স্যার। ফেসবুক থেকে তার স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হলো।

“ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয় ক্লাবে কয়েকজন শিক্ষকের সাথে আড্ডা চলছিলো। এমন সময়ে একজন শিক্ষকের এক বহিরাগত বন্ধু বললেন, ভাই আপনারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমালোচনা করছেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধঃপতনে আপনারাই তো মূখ্য ভূমিকা রাখছেন। আপনারাই তো শিক্ষকতায় ফাঁকি ঝুকি দিচ্ছেন চরম ভাবে, গবেষণার গ ও করছেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের বারোটা বাজবে না তো কি!

অন্যান্য শিক্ষকেরা একজন আরেকজনের দিকে চাওয়া চাওয়ি করে হ্যাঁ হু করে অন্য প্রসঙ্গে যাওয়ার চেষ্টা করলো। আমি খুবই আন্তরিকভাবে বললামঃ আপনি শতকরা একশত দশ ভাগ সত্যি কথা বলেছেন। এ জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

আসলে এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই চরম অধঃপতনে আমরা সবাই কম বেশী দায়ী। অন্যের কথা জানি না। নিজের কথাটাই বলি। আমি শিক্ষক হিসেবে হয়তো আমার নিজের দায়িত্ব ঠিক ঠাক ভাবে পালন করি এবং দায়িত্বের বাইরে অনেক কিছু করার চেষ্টা করি ছাত্র ছাত্রীদের জন্য। কিন্তু সেটাই যথেষ্ট নয়। গবেষণার ট্র্যাক রেকর্ড আমার খুবই দুর্বল। প্রমোশন তো দূরের কথা, একটা আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে অনেক আগেই বের করে দিতো আমার এই ধরনের নিম্ন মানের গবেষণার জন্য।

কিন্তু আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করি, আমি এই নিম্ন মানের কাজ যতটুকুও করেছি, কিন্তু একটা বিরাট সংখ্যক শিক্ষক শিক্ষিকা, তাঁর থেকেও নিম্ন মানের কাজ, এমনকি কেউ কেউ কিছুই না করে দিব্যি প্রফেসর হয়ে ঘুড়ে বেড়াচ্ছে। অনেকের পিএইচডি পর্যন্ত নেই। আর যাদেরও আছে, তাদের কেউ কেউ এই মহান বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তাঁর প্রিয়ভাজন সহকর্মীর আস্থায় একটা ডিগ্রী নিয়েছে। অথবা বাইরের অগা মগা, যিনি মহিষ তিনিই শ্বশুর এই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী নিয়েছেন। ডিগ্রী নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পদ ভিসি হয়েছেন। আবার কেউ কেউ পিএইচডি ছাড়াই ভিসি হয়েছেন, যেটি এক কথায় অকল্পনীয় আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে ।

একটা মান সম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর পর্যন্ত হতে পারলে, সেটাতে বোঝা যায় যে এই প্রফেসরশীপ পেতে তাঁকে বিশাল খাটুনী, কাঠ খড় পোড়াতে হয়েছে। আমার পিএইচডির পর আমার প্রফেসর আমাকে বলেছিলেন, রুশাদ, তুমি যদি আমেরিকায় একটা ভাল একাডেমিক জবে টেনিয়ুর পেতে চাও তাহলে তোমাকে আর তিন চারটা পিএইচডির সমান কষ্ট করতে হবে।

একাডেমিক বা রিসার্চ ক্যারিয়ারে একটাই কথাঃ Publish or perish. সোজা বাংলায়, গবেষণা করে ভাল জার্ণালে পাবলিশ করো নয়তো বিদেয় হও। আর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, publish or not, you perish only when you yourself perish. আবার সোজা বাংলায় , পাবলিশ করেন আর নাই করেন, আপনি নিজে মরা না পর্যন্ত আপনার চাকুরী মরবে না।

এইরকম শান্তির পূর্ণ নিরাপত্তাযুক্ত চাকুরী কোথাও আছে? কিছুই করতে হয় না, পড়াইলাম কি পড়াইলাম না, গবেষণা করলাম কি করলাম না, প্রমোশন ঠিকই হয়ে যায়। কি আনন্দ, স্বর্গীয় ব্যাপার একদম!

আমি বলছি না যে সব শিক্ষক শিক্ষিকাই এইরকম ফাঁকিবাজি করছেন। কিছু শিক্ষক শিক্ষিকা আছেন যারা সত্যিকারের ভালো গবেষণা করছেন। উন্নত জায়গায় পাবলিশ করছেন। তাঁরা আসলেই শ্রদ্ধা পাবার যোগ্য। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তাঁদের সংখ্যা খুবই কম।

কিন্তু এই সংখ্যাটা এইরকম কমই হওয়ার কথা। কারণ ভালো গবেষণার কোন ইন্সেন্টিভ তো এখানে নেই। অনেক শিক্ষক শিক্ষিকাই বলেন যে গবেষণা করতে টাকা লাগে, ফান্ড লাগে, সেটাই নাই। খুব ভালো যুক্তি, কিন্ত এর মধ্যে বিশাল ফাঁক আছে।

ফান্ডের প্রবলেম আছে, কিন্তু তাঁর যেয়েও বড় প্রব্লেম হলো ভালো গবেষণার কোন ইনসেনটিভ নাই।

আমাদের ইকনমিক্সে টপ জার্ণাল হলো আমেরিকান ইকনমিক রিভিউ। যেখানে পাবলিশ করতে গেলে জান কালি করেও করা যাবে কিনা সন্দেহ। আর এই দিকে ঢাবির সোশাল সাইন্স রিভিউ যেখাকার মান কিরকম এটা বলে আর নিজেদের ছোট করতে চাইনা। এখন এই দু’জায়গায় পাবলিকেশনকে যদি একই পয়েন্ট দিয়ে মূল্যায়ন করা হয়, কিন্তু তাহলে কার বাবা ঠেকা পড়ছে জান কালি করার?

কিছু ত্যানা ম্যার্কা জার্ণালে, ত্যানা মার্কা পাবলিকেশন, সেই সাথে বিভাগের উচ্চ পদস্থ ব্যক্তিদের একটু কৃপা দৃষ্টি আর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অনুকূলে থাকাটা নিশ্চিত করেই যদি ধাঁ ধাঁ প্রমোশন হয়ে যায়, তাহলে কার ঠ্যাকা পড়ছে এই বিশাল ঝামেলায় যাওয়ার!

তাঁর চেয়ে কত ভালো চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে ২৩ ঘন্টা একটা গবেষণা নামক একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে সেখান বসে থাকলাম, মাঝে মধ্যে এসে ঘন্টা খানেকের জন্য একটা ক্লাস নিয়ে নিলাম। ঘর সংসার করছি, মাঝে মধ্যে ভ্যানিটি ব্যাগ ঝোলাতে ঝোলাতে এসে একটা ক্লাস নিয়ে আবার বাসায় চলে যাচ্ছি। এনাদের কারো কারো ত্যানা মার্কা পাবলিকেশন করারও সময় নাই। উনারা পড়ান অতি জঘন্য, সেই বিষয় পড়ান সেই সম্বন্ধে ভালো কোন ধারণা নাই, ক্লাসে এসে কোন মতে গড় গড় করে কিছু একটা পড়ে বা লিখে সময়টুকু ব্যয় করে চলে যান। গবেষণা তো শত সহস্র মাইল দূরবর্তী বিষয়, সেটি ত্যাঁনা মার্কা হলেও।

কিন্তু তাঁরা অনেকেই দিব্যি প্রফেসর অব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়! ওয়াও কি তামশা! লজ্জা লাগে খুবই লজ্জ্বা লাগে। কিন্তু উনারা লজ্জ্বা পান না। বুক ফুলিয়ে দাপটে ঘুড়ে বেড়ান। তাঁদের হুংকারে বা পদচারণায় বিভাগ কেঁপে কেঁপে ওঠে। হুমম! প্রফেসর বলে কথা।

শেষ কথা, আমার এই পর্যবেক্ষন বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষক শিক্ষিকার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না। কিছু কিছু শিক্ষক শিক্ষিকা আছেন যারা সত্যিকারের নিবেদিত প্রাণ এবং উচ্চ মানের গবেষণা করছেন। তাঁদের প্রতি আমি আন্তরিক শ্রদ্ধা জানাই। আসলে এরকম কিছু শিক্ষক শিক্ষিকার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনও চলছে, টিকে আছে, কিছুটা সন্মানের জায়গা এখনও ধরে রেখেছে।

আমি এই ধরনের শিক্ষক শিক্ষিকাদের কাতার থেকে অনেক নীচে। কারণ আগেই বলেছি, আমার গবেষণা আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় বেশ নিম্ন মানের। চেষ্টা করবো সামনে গবেষণার মান আরো উন্নত করার। যদি না পারি তা হলে একাডেমিক প্রফেশন ছেড়ে হয়তো অন্য কিছু ধরতে হবে। কিন্তু তারও আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে দু’তিনটা মামলায় জিততে হবে।”

ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে……..

জনাব রুশাদ ফরিদী

সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!