বিশ্বাস নিয়ে তর্ক: হেদায়েত হাতে নাতে

Reading Time: 2 minutes

কার ধর্মচর্চা শুদ্ধ হচ্ছে এ নিয়ে ইদানীংকার তর্ক দেখলে আমার মনে পড়ে ছোটবেলার তারাবি নামাজের কথা। সীতাকুণ্ড স্টেশন জামে মসজিদটি ছোট এবং ছিমছাম। পাখা ছুঁই ছুঁই দূরত্বে একেকটি সিলিং ফ্যান লাগানো। সবগুলো সবসময় সর্বোচ্চ বেগে চলে। আওয়াজ আর বাতাসে মনে হয় সমুদ্র সৈকতে নামাজ পড়ছি। পার্থিব সেই অনুভূতির সঙ্গে অপার্থিব এক অনুভব মিলে একটা ঘোর লেগে যেত আমার। সেই ঘোরে আমি ধীরেসুস্থে রুকু-সিজদায় যেতাম, আমার পাশেই আমার প্রিয় বন্ধুটি পড়ত ইমামের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে।
সদ্য তারুণ্যে পা দেয়া এক হাফেজ এসেছে সেবার। খতম তারাবি পড়াবে। আমাদের জন্য বিষয়টা নতুন। কোনও কোনও দিন সবকিছু কেমন দ্রুত শেষ হয়ে যেত। সে দিনগুলোতে আমি প্রায়ই পেছনে পড়ে যেতাম। আমার বন্ধুটির আমাকে তাড়া দিত। বলতো আমার নামাজ সহি হচ্ছে না, আমি নামাজ পড়তে এসে আরাম করছি। আপনি তখন তাকে বলতাম, দেখ ভাই, তারাবি কথাটির ব্যুৎপত্তি তারাব থেকে, আরবি তারাব শব্দের অর্থে আরাম, সেই বাবদে তারাবি আরামের নামাজ।

বন্ধুটি আমার আশা ছেড়ে দিল। আমার নামাজ হচ্ছে না; বেহেশতে আমি তার সঙ্গী হব না এই ব্যথায় বিমর্ষ হলো। বন্ধুর জন্য বন্ধুর এমন দরদ আমাকে সবসময় ছুঁয়ে যায়। এবার ছুঁলো না। আবার মনে হলো সারাদিন রোজা রেখে, ইফতারে এত্তোগুলা খাবার খেয়ে, ওভাবে তাড়াহুড়া করে রুকু-সিজদা করলে আমি যে ঘোর নিয়ে নামাজ পড়ি সেটা কেটে যাবে। আমি তা চাইনা। পেটে ভুটভুট করলে মনযোগ দেয়া কঠিন। নামাজে আমার মনোযোগ খুব দরকার।
ওই মনোযোগ দিয়ে আমি খোদার সান্নিধ্য অনুভব করতাম। উপেক্ষা করতে পারতাম আমার পরিপার্শ্বকে। মনে করতে পারতাম আমি নামাজে দাঁড়িয়েছি একা কোনও পাহাড়ের চূড়ায়, কোনও জলপ্রপাতের পাশে, বিস্তীর্ণ কোনও সবুজ প্রান্তরে প্রবল বর্ষণের মাঝে, নিদেন পক্ষে সমুদ্রের মাঝে একটা ছোট্ট সবুজ দ্বীপে। আমার এসব ভাবনার কথা বন্ধুকে বলতেই একদিন সে বলে বসল আমি নামাজের উদ্যেশ্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নই।

ওর কথা সেদিন আমার লেগে গেল। তর্ক করতে গিয়ে টের পেলাম আমার অহং আজেবাজে সব যুক্তি যোগাড় করছে। আমি কত জানি সেটা জানানোর একটা তাগিদ বোধ করতে লাগলাম। ধর্মে বরাবরই সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছি, কিছুদিন যে গ্রামের মসজিদে ইমাম ছিলাম এসব বলার চাপ অনুভব করতে লাগলাম। পরক্ষণেই বুঝলাম এসব তর্কে গেলে নিজের মধ্যে একটা অহংকারী নির্বোধের জন্ম হয়, যে নিজের সমর্থনে তুচ্ছ জিনিশকে বড় এবং প্রাসঙ্গিক করে তুলতে চায়।

আমি খোদার কাছে আমার সেই অহং অনুভূতির জন্য ক্ষমা চাইলাম। তাঁকে বললাম আমাকে এবং আমার বন্ধুকে হেদায়েত করতে। সেদিনই হেদায়েত এলো। বন্ধুকে পাশে নিয়ে নামাজ পড়ছি। বন্ধু ঝড়ের বেগে রুকু-সিজদায় যাচ্ছে, ফিরে আসছে। ফ্যানের বাতাসে তার সফেদ লুঙ্গি ফুলে ফুলে উঠছে পেট ফোলা পালের মতো। হঠাৎ তার মুখ থেকে আঁৎ করে একটা আর্ত আওয়াজ বেরিয়ে এলো। আশেপাশের সমবয়সী বালকেরা হাসি চাপতে গিয়ে ঘোঁত ঘোঁত করতে লাগলো, অতঃপর সশব্দে হাসিতে ফেটে পড়ল।
হয়েছে কী, বন্ধুর অন্য পাশে এক বয়স্ক মুরুব্বি, বন্ধুটির লুঙ্গির উপর বসে পড়েছিল। সিজদা থেকে সহসা সটান হতে গিয়ে বন্ধু সেদিন বুঝতে পেরেছিল, নামাজ ইমামের দ্রুতিতে নয়, কাতার-পরিজনের ছন্দে পড়তে হয়, নাহলে নাঙ্গা হবার ঝুঁকি থাকে। এটা বন্ধুর জন্য শিক্ষা ছিল। তাতে আমার আনন্দ হতে পারতো। কিন্তু হয়নি। আমি তখনও ধর্মে ওর চেয়ে বেশি নম্বর পাওয়াটাকে তর্কে আমার তুরুপের তাস বলে ভেবেছিলাম সেই আহাম্মকির লজ্জা কাটাতে পারিনি। যদি সেদিন ঐ রকম অন্তঃসারশূন্য অহংকার না দেখাতাম, ঐ বালকদের সঙ্গে প্রাণখুলে হাসতে পারতাম।

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!