বুক রিভিউঃ দ্য প্রফেট,কাহলিল জিবরান

Reading Time: 8 minutes

বিশ শতকের যে কয়েকজন লেখক মুক্তচিন্তার বিকাশ ঘটিয়েছেন বা প্রচেষ্টা চালিয়েছেন তাদের মধ্যে খলিল জিবরান বা কাহলিল জিবরান অন্যতম। দ্য প্রফেট জিবরানের অনবদ্য সৃষ্টি। চল্লিশটিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে যে কাব্য-নিবন্ধটি সেটার শিল্পমান যে কত উচ্চমার্গীয় তা বলাই বাহুল্য। ১৯২৩ সালে প্রথম আমেরিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে এই গ্রন্থের পাঠকপ্রিয়তার শুরু, যার পাঠ চলছে আজ অবধি। খোদ বাংলাদেশেই পাওয়া যায় এর ৮ টি অনুবাদ। সহজেই বোঝা যায় দ্য প্রফেট নিয়ে বাঙালির আগ্রহের কমতি নেই।

এই বইটি কাল জয় করেছে কিছু অসাধারণ দর্শনের কারণে। কিছু প্রশ্নোত্তর, কিছু স্মৃতি হাতড়ানো, জীবন মৃত্যুর মাঝে কিছু অনুভূতি, বলা যায় মানব জীবনের মৌলিক সকল অনুষঙ্গ বিষয়ে দারুণ মৌলিক কিছু দর্শন, মনোভাব, দিকনির্দেশনা ওঠে এসেছে এই গ্রন্থে। তবে সব বইয়ের সব কথাই যে সমানভাবে সমাদৃত হয়েছে তা নয়, কিছু কিছু অংশ হয়তো সমালোচিতও হয়েছে।

( ১০০০-১৫০০ শব্দে এই বইয়ের রিভিউ লেখা পুরোপুরি অসম্ভব। আমি চুম্বক কিছু অংশের রিভিউ লিখেছি। তবে চেষ্টা করেছি সবগুলো চ্যাপ্টার এর কিছু কিছু যাতে থাকে।)

প্রফেট,আল মুস্তফা; ১২ বছর কাটিয়েছেন ওরফালেজ শহরে। ১২ বছরে কত আবেগ, ঘোর মিশে আছে আল-মুস্তফার মানসপটে। বিদায়বেলায় একের পর এক স্মৃতি ভেসে আসছে, কে ঠেকায় আবেগের এই স্রোতকে?

“চিৎকার করে ওঠলেন অন্তরের অন্তঃস্তল থেকে-

হে আমার আদি মায়ের সন্তানেরা-

তোমরা সাগর পাড়ি দিয়েছ-

আমার স্বপ্নে তোমরা কতবার পাড়ি জমিয়েছ

আজ এসেছ আমার জাগরণে, আমার গভীরতম স্বপ্নে।।

সবাই আটকাতে চাইলো আল মুস্তফাকে। ক্ষুদ্র এই বন্ধনে আটকাবার মত কিইবা আছে তাদের। তবে ভালেবাবাসার কমতি যে ছিলনা সেই মানুষগুলোর সেটা বোঝা যায়। কাঁদছেন প্রফেট, কাঁদছেন সবাই। এমন সময় জনসমক্ষে বেড়িয়ে এলেন আলমিত্রা। বললেন, মুস্তফাকে যেতে দিতে হবে, তবে যাওয়ার আগে যেন সেই সত্যের কথাগুলো বলে যান, যেগুলো মশাল হিসেবে কাজ করবে ওরফালেজ শহরে।

এরপর শুরু হলো সেই সত্য সন্ধানী প্রশ্নোত্তর পর্ব। মোট ২৭ টি ভাগে এই প্রশ্নোত্তর চলে।

প্রথমেই আলমিত্রা জিজ্ঞেস করলেন ভালোবাসা নিয়ে।

When love beckons you, follow him

though his ways are hard and steep

“ভালোবাসা যখন হাতছানি দেয়-

তাকে অনুসরণ করো;

জেনে রেখো ভালোবাসার পথ-

রুক্ষ কঠিন।

ভালোবাসা এমন এক জিনিস যেটায় বিশ্বাস স্থাপন করতে হয় ভেতর থেকে। ভালোবাসতে গিয়ে স্বপ্ন বিচূর্ণ হতে পারে। ‘গভীর ভালোবাসা শুধু কাছেই টানে না, দূরেও সরিয়ে দেয়”। ভালোবাসা উঁচুতে যেমন ওঠায়, নীচেও নামায়। শুধু একঘেয়ে আনন্দ পাওয়ার নাম ভালোবাসা নয়, ভালোবেসে জ্বলন্ত আগুনে ঝাঁপ দেয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ।

পরের প্রশ্ন বিয়ে নিয়ে। অর্ধাঙ্গ বা অর্ধাঙ্গী সংক্রান্ত। গভীর জীবনবোধে প্রফেট বলেছেন,

But let there be spaces in your togetherness

And let the winds of the heavens dance between you

তবে, কিছুটা জায়গা ছেড়ে দাও-

তোমাদের মিলনের মাঝখানে

যেন বয়ে বেড়াতে পারে স্বর্গের পবিত্র বাতাস।

জঙ্গলে যেমন সবগাছ একসাথে থাকে কিন্তু তাদের মাঝেও কিছু ফাঁকাস্থান থাকে যার ভিতর দিয়ে বাতাস প্রবাহিত হয়, বাঁশির ছিদ্রগুলো একসাথে কিছুটা দূরে দূরে থাকার কারণেই যেমন সুরের সৃষ্টি হয়, তেমনি ভালোবাসতে বলা হয়েছে কোন পিছুটান ছাড়াই, কোন অদৃশ্য বন্ধনে না আটকে। এতেই স্বাধীনতা থাকবে,আনন্দের প্রাণভোমরা ওড়বে।

পরের প্রশ্নের বিষয় শিশু।

এক মায়ের প্রশ্নে আল মুস্তফা বলেন, একটি শিশু তার বাবা মায়ের উসিলায় আসে বটে, কিন্তু এর অন্তর্নিহিত অর্থ আরও গভীর। প্রত্যেকটি শিশু স্বতন্ত্র।

You may give them your love but not your thoughts,

For they have their own thoughts

তোমরা তাদের ভালোবাসা দিও-

চিন্তা দিও না।

তাদের নিজেদেরই আছে চিন্তা, আছে ভাবনা।।

 বাবা মা তাদেরকে ভালোবাসবে, কিন্তু তাদেরকে বেড়ে ওঠতে দিতে হবে স্বকীয় চিন্তায়। পিতামাতার কোন ইচ্ছা তার সন্তানকে দিয়ে পূরণ করানো ঠিক নয়। শিশুকে তুলনা করা হয়েছে তীরের সাথে, আর তার পিতামাতাকে বলা হয়েছে ধনুক। এই ধনুক থেকেই তীর ছুটে যাবে অনন্তের পথে, বহু দূরে।

পরের প্রশ্ন দান নিয়ে। দান সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন এক ধনী ব্যক্তি। তিনি উত্তরে বলেন মানুষ তার সম্পদকে যক্ষের ধনের মত আগলে রাখে তার কারণ সে সবসময় ভয়ে থাকে ভবিষ্যতের প্রয়োজন নিয়ে। সমাজের চিরায়ত বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে তিনি বলেন, অনেকের ভুড়ি ভুড়ি সম্পদ থাকলেও তারা সামান্যই দান করেন, যা করেন তাও আবার দেখানোর জন্য। যেন “লিখে রেখো এক ফোঁটা দিলেম শিশির”। আবার অনেকেই থাকেন সমাজে যাদের অল্প থাকলেও তারা দান করেন উদারহস্তে, দেওয়ার মধ্যেই তারা আনন্দ খুঁজে পান।

And there are those who give with pain and that pain is their baptism

যারা দান করে বেদনা কাতরতায়, সেই বেদনাই তার ভবিষ্যতের দীক্ষা

দান করার ব্যাপারে দুটি বিষয় লক্ষণীয়। লেখক বলেন, কেউ চাইলে দান করা ভালো, কিন্তু তার চাইতে ভালো হলো চাওয়ার আগেই অভাবিকে দান করা।

এরপর এক বৃদ্ধ লোক পানাহার সম্পর্কে জানতে চাইলেন। প্রফেট বলছেন গাছ, প্রাণী হত্যা না করে যদি শুধু আলো বাতাস খেয়ে বেঁচে থাকা যেত তাহলেই বোধহয় ভালো হতো। কিন্তু তা যেহেতু সম্ভব নয়, সেহেতু খাওয়ার উদ্দেশ্যে প্রত্যেকটি জীবকে হত্যা করার সময় আমাদের মনে রাখতে হবে আমাদেরও জীবন আছে এবং আমাদেরকেও একসময় নিঃশ্বেষ হয়ে যেতে হবে। যাকে আমরা নিঃশেষ করছি তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে যে তার আত্মত্যাগ, বিসর্জনের বদৌলতেই আমাদের নিশ্বাস চলে।

পরে আল মুস্তফা কাজের মাহাত্ম্য সম্পর্কে ধারণা দেন। সুন্দর পৃথিবী গঠনে কাজের বিকল্প নেই। কাজ ছাড়া ব্যক্তি কপালের দোষ দেয়। আর যে ব্যক্তি একটিভ থাকেন , তিনি নিজের ললাটের রেখা নিজেই ঠিক করে নেন।

And I say that life is indeed darkness save when there is urge;

And all urge is blind save when there is knowledge,

And all knowledge is vein when there is work,

And all work is empty save when there is love;

“আর আমি বলি,

উদ্যমহীন জীবন মানে অন্ধকার জীবন।

আর জ্ঞানহীন উদ্যমও অন্ধকার।

কর্মহীন উদ্দীপনা অর্থহীন-

আর ভালোবাসার ছোঁয়া ছাড়া অর্থহীন সকল কাজ।’’

আনন্দ বেদনা সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তরে প্রফেট বলেন, সুখ দুঃখ পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। যে স্বর্ণ পরে মানুষ সুখ পায়, আভিজাত্য পায় তাকে কি কম পুড়তে হয় স্বর্ণকারের কাছে। যেই বাঁশির ‍সুর শোনে আমরা বিমোহিত হই, সেই বাঁশিতে কি ছুরির ধারালো আঘাত পড়ে নি। এই কারণে আল মুস্তফা বলছেন, যখনই তোমার সুখ দেখ, একটু ভালো করে অনুসন্ধান করলেই বুঝতে পারবে কোন না কোন দুখ পেয়ে তুমি এই সুখ পেয়েছ।।

Some of you say, Joy is greater than sorrow, and

Others say, nay, sorrow is the greater.

But I say unto you, they are inseparable.

কেউ বলে, দুঃখের চেয়ে আনন্দ বড়

আবার কেউ বলে-

না, দুঃখই বড় আনন্দের চেয়ে।

আর আমি বলি, এ দুই অবিভাজ্য।

প্রফেট আল মুস্তফা শহরের চেয়ে গ্রামকেই বেশি ভালোবাসেন। তিনি পারেন তো সব বাড়িঘরকে গ্রামে পাঠিয়ে দেন বন জঙ্গলের ধারে যেখানে মাটির কাছাকাছি থাকা যায়। পূর্বপুরুষেরা সেই যে বাড়িঘরের দেয়াল তৈরি করেছে কিছু ভয়ে, আরামের প্রত্যাশায়, সেই ভয় কি কেটেছে কিংবা সেই কাঙ্খিত শান্তি কি পাচ্ছে বদ্ধ ঘরের মানুষগুলো। আরামআয়েশ মানুষের ঘরে ঢোকে অতিথি হয়ে, কিন্তু একসময় হয়ে যায় প্রভু। নিয়ন্ত্রণ করে সেই মানুষকে।

Verily the lust for comfort murders the passion of the soul, and then walks grinning in the funeral

আসলে আরাম আয়েশের তীব্র লালসা

মৃত্যু ঘটায় আত্মার আবেগের,

তারপর হাসতে হাসতে যোগ দেয় সৎকারে।

 

কাপড়চোপড়ের ব্যাপারে কি চিন্তা করেন আল মুস্তফা। এ ব্যাপারে তিনি দারুণ প্রগতিশীল। কাপড়চোপড় এর স্বাধীনতা দিয়েছেন তিনি। ‘কাপড়ের স্বল্পতা হলেও ভালো হতো যদি যদি তোমার শরীর পেত আরও বেশি রোদ আর বাতাসের স্পর্শ।’ শালীনতা, ভদ্রতা, সংযমই হলো কুরুচির বিরুদ্ধে হাতিয়ার। মনের কলুষতা দূর না হলে কাপড় দিয়ে শরীর ঢেকে লাভ নেই। And forget not that the earth delights to feel your bare feet and the winds long to play with your hair

পরের প্রশ্নে আল মুস্তফা এথিকস অব বিজনেস নিয়ে বলেছেন। যে ব্যবসাতে প্রেম নাই, ন্যায় নাই, সে ব্যবসাতে লোভ আসে, সে ব্যবসাতে ঠকবাজি চলে। তবে প্রাচুর্য এমনি এমনি আসে না। মাটি থেকে মুঠোভরে ফসল তুলে আনতে জানতে হয়। আর এসথেটিক ব্যাপারগুলোও যে কিনতে হয়, না হলে যে কবির ভাত জুটবে না কিংবা নাচনেওয়ালীর খাওয়া পরার বন্দোবস্ত হবে না সে কথাও উদ্ধৃত হয়েছে। যার কিছুই নেই ব্যবসা করার মতো সে কপর্দকহীন ব্যক্তিও যেন ব্যবসার ময়দান থেকে খালি হাতে ফিরে না যায় এটিই ছিল আল মুস্তফার প্রত্যাশা।

অপরাধ এবং শাস্তির সম্পর্কে প্রফেটের কথাবার্তায় জীবনবোধের গভীরতা সম্পর্কে বোঝা যায়। মানুষ যখন অন্যের প্রতি অন্যায় করে, সে আসলে নিজের প্রতিই অন্যায় করে। সেই অন্যায়ের প্রায়শ্চিত্ত করতে হলে নিজের ভেতরের পুণ্যাত্মাকে খুঁজতে হবে। নিজেকে করতে হবে মহাসাগরের মতো যেখানে ছোটখাট পাপকাজসমূহ খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে। তবে হ্যাঁ, অন্যায়কারীকে অন্যায় করতে দেখা সত্বেও যারা প্রতিরোধ করেন না, কিংবা যেখানে অন্যায় করার সম্ভাবনা রয়েছে সেখানে সতর্ক করেন না, তারাও সমানভাবে দোষী। অন্যায় করার সুযোগ যে দেয় তার দায় কম নয়। লোকে আমাদের ঠকায়, কারণ আমরা ঠকাবার সুযোগ দেই। শাস্তি দানের মৌলিক নীতিবোধ সেটাই। শুধু অপরাধীকে শাস্তি না দিয়ে এর কারণ অনুসন্ধান করে, ঠিক কি কারণে অপরাধ ঘটলো সবকিছু বিবেচনা করে শাস্তিদানের প্রক্রিয়া চালাতে হবে। বাদি যেমন ন্যায়বিচার পাওয়ার যোগ্য তেমনি বিবাদিও ন্যায্য বিচার পাওয়ার দাবিদার।

তাহলে আইনের কি হবে? মুস্তফা বলেন, মানুষ আইন করে আইন ভাঙার জন্য। এই আইন অনেকসময় মানুষের ভিতরকার সত্বাকে খোঁজে পেতে দেয়না। স্বাধীনতার অনেক প্রকরণ ব্যর্থ হয়ে যায় আইনের বাঁধায়। কিন্তু আমরা যদি নিজেদের সামর্থ্যের ভিতরে স্বাধীনভাবে চলতে পারি তাহলে আইনের প্রয়োজন নেই।

তাহলে স্বাধীনতা সম্পর্কে প্রফেট কি বলেন? আল মুস্তফা দেহের স্বাধীনতার চেয়ে মনের স্বাধীনতাকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। যখন আমরা ভাবনাহীন, অভাবহীন মন নিয়ে দিবস-রজনী যাপন করতে পারবো তখনই স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়া যাবে। স্বাধীনতার আসলে নির্দিষ্ট কোন মানদন্ড নেই। আল মুস্তফা বলেন, তোমরা যাকে বলো স্বাধীনতা, সে-ই তো কঠিনতম বন্ধন। সুতরাং ভাবতে হবে যে বিষয়ের ওপর কিংবা যার কাছ থেকে আমরা স্বাধীনতা চাই সে ব্যাপারে আমরা মনের মধ্যে অধীনতা পুষে রাখছি কি না। যদি তাই হয় তাহলে স্বাধীনতা পেলেও আমরা শৃংখলমুক্ত হতে পারবো না।

এবার আল মুস্তফা বলেন আমাদের যুক্তি ও আবেগ সবসময় বিপরীত দিকে চলে। কিন্তু যুক্তি ও আবেগকে তিনি তুলনা করেছেন জাহাজের হাল ও পালের সাথে। একটি ছাড়া অপরটি যেমন অর্থহীন ও অকেজো তেমনি যুক্তি ছাড়া আবেগ খোঁড়া, আর আবেগ ছাড়া যুক্তি অন্ধ। বাড়িতে দুইজন অতিথি এলে যেমন নির্দিষ্ট কারোর প্রতি অন্যাবশ্যকীয় আদর দেখানো অনুচিৎ তেমনি সমান ভালোবাসা ও আস্থা পাবার অধিকার রাখে যুক্তি ও আবেগ দুটোই। You to should rest in reason and move in passion. যুক্তিতে হোক তোমাদের স্থিতি, আর আবেগে হোক গতি।

Your pain is the breaking of the shell that encloses your understanding. অর্থাৎ বেদনা সম্পর্কে প্রফেটের ভাষ্য হলো আমাদের জানাশোনায় যখন চিড় ধরে তখন আমাদের বেদনা হয়। বেদনা কে জানতে হয়, চিনতে হয়; না হলে দৈনন্দিন জীবনের এত প্রকরণ, এত জাদুমায়া সম্পর্কে আমরা বোঝদার হবো কিভাবে? প্রকৃতিতে যেমন শীতের পরে বর্ষা আসে, তেমনি মানব প্রকৃতিতে পৌষ মাসকে মেনে নিতে হবে।। আর যেহেতু বেদনা আসাটাই স্বাভাবিক, এটাকে মেনেও নিতে হবে খুব স্বাভাবিকভাবে, শান্ত হৃদয়ে। বুঝতে হবে যে আমাদের অসুস্থ দেহকে সুস্থ করার জন্যই ডাক্তার ছুঁরি চালায় আমাদের দেহে, তাহলে সুখ পাওয়ার জন্য বেদনায় নিমজ্জিত হতে দোষ কি?

মানুষের আত্মজ্ঞানের পরিধি কতটুকু? আত্মজ্ঞানকে তো শব্দে রূপ দিতে হয়, ভাষা দিতে হয় ভিতরের ধ্বনিকে। তবে হ্যাঁ. এটি সহজ নয়। জ্ঞানের কুয়োর জল ভেদ করে, খাল বিল পেরিয়ে যেতে হবে সমুদ্রের পানে। তবুও কি কেউ জ্ঞানী হয়ে যায়? প্রফেট বলেন, জ্ঞানীদের আত্মতৃপ্তিতে ভুগলে চলবে না। একটা একটা সত্যের পথ ধরে এগিয়ে যেতে হবে আত্মার পথ বরাবর।

শিক্ষাদান সম্পর্কে এক শিক্ষক প্রশ্ন করলে আল মুস্তফা বলেন, মানুষের লুকায়িত জ্ঞানকে জাগ্রত করাই শিক্ষা। শিক্ষক ছাত্রকে নিজের জ্ঞান দেয়ার জন্য নয় বরং শিক্ষার্থীর ভেতরের জ্ঞানালোক আবিষ্কারের নিমিত্ত। নিজের অন্তরের গভীরে, চিন্তায় দূরদৃষ্টি আনতে পারাই শিক্ষাদানের সাফল্য।

A friend in need is a friend indeed , প্রয়োজনের বন্ধুই প্রকৃত বন্ধু। এই উক্তিটি প্রফেটের। বন্ধুর সাথে যখন কথা হয় তখন মন খুলে বলতে হবে। দ্বিধাহীন চিত্তে বন্ধুকে পরামর্শ দিতে হবে।কাছের বন্ধু দূরে চলে গেলে কষ্ট পাওয়া যাবে না। কারণ সমতল থেকে পাহাড়চূড়া যেমন স্পষ্ট দেখা যায় তেমনি দূরে থাকলে বন্ধুর বন্ধুত্বের মর্ম বোঝা যায়।

কথা বলতে হয় কিভাবে? প্রফেট বলেন কথা বলার চেয়ে হৃদয়ের নির্জনতা শ্রেয়। চিন্তার অর্ধমৃত্যু ঘটায় তোমাদের অতিকথন।  তাই কথা বলতে হবে চিন্তা করে,প্রাঞ্জলভাবে। নিজের অন্তরের গভীরতম ধ্বনিকে ভাষা দিতে পারাটাই তো উৎকৃষ্ট কথন।

প্রফেট সময়কে একটি বিমূর্ত জিনিস হিসেবে তুলে ধরেছেন।আমরা সে সময়কে মাপতে চাই যেটি কিনা অসীম, প্রান্তহীন।এক ঋতু যেমন আরেকটি দিয়ে আবৃত থাকে, তেমনি আজকের সময়ও বিচ্ছিন্ন নয়, অতীত যার পিতা, ভবিষ্যৎ তার সন্তান।                                                                                                                                                                                                   প্রফেটের সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক হলো তিনি মন্দকে স্বীকার করেননা। মানুষ যখন ক্ষুধা তৃষ্ণায় নিমজ্জিত হয় তখনই মন্দের আশ্রয় নেয়। ভালো মানুষ কখনো দুর্বলকে লজ্জা দেয়না কিংবা তার অক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে না। আর একবার লাইনচ্যুত হলেই যে কেউ খারাপ হয়ে যায়,তা নয়। এটি সাময়িক ছন্দপতন।

মানুষের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো সে শুধু তার দু:খ দুর্দশায় প্রার্থনা করে। কিন্তু আল মুস্তফা বলছেন আনন্দের আতিশয্যে আমরা যদি প্রার্থনা করতে ভুলে যাই তাহলে প্রার্থনা পরিপূর্ণতা পাবে না। মসজিদ, মন্দিরে যদি আমরা কেবল চাইতেই যাই তাহলে প্রার্থনা হবে না। বরং সেখানে স্থাপন করতে হবে স্রষ্টার সাথে এক অদৃশ্য যোগাযোগের।

 এক সন্ন্যাসী প্রফেটকে আনন্দ নিয়ে কিছু বলতে বললেন। তিনি বলেন, আনন্দ মুক্তির গান কিন্তু মুক্তি নয়। আমরা আনন্দ উপভোগ করবো কিন্তু তা যেন আমাদের বোধশক্তির বিনাশ না ঘটিয়ে দেয়। আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম এই সিনড্রোমে ভুগেন যারা অর্থাৎ পূর্বের আনন্দ নিয়ে যারা অনুতাপ করেন, তারা যেন আনন্দকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। তা না হলে আত্মার আনন্দ বিস্মৃত থেকে যাবে।সৌন্দর্য নিয়ে কি বলেন প্রফেট। সৌন্দর্য তো আপেক্ষিক। একজন তরুণী মা যেমন লাজুক, সৌন্দর্য তেমন। এ কারণে সৌন্দর্যকে নির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেয়া যায় না। অন্তর থেকে অনুভব করতে হয় সৌন্দর্যকে।

মানুষের সকল কাজ এবং ভাবনাই ধর্ম। মানুষ যা করে তাই তো তার পেশা, বিশ্বাস ছাড়া কি পেশা হয়, আর ধর্ম ছাড়া কি বিশ্বাস আসে? ধর্ম তো একটা ব্যবস্থা যার ভিতর দিয়ে পুরো জীবন যাপন করতে হয়। জীবনের সকল অনুষঙ্গে যদি স্রষ্টাকে মেশাতে না পারি, তাহলে ধর্ম পরিপূর্ণ হবে না।

এবার আলমিত্রা শেষ প্রশ্নটি করলেন। মৃত্যু নিয়ে। আল মুস্তফা বললেন, জীবনকে ঠিকমতো চিনতে পারলে মৃত্যুকে চেনা যাবে। শীতকালে যে বীজ কল্পনাও করতে পারেনা অঙ্কুরোদগমের, সেই বীজই বসন্তে চারা হয়ে মাটি ফুঁড়ে বের হয়ে আসে। তাহলে মৃত্যু কি আরেক জীবন। এক জীবনের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে কি আরেক জীবনের বন্ধন খুলে যাবে? কে জানে??

সন্ধ্যা হয়ে গেল। আল মুস্তফাকে যেতে হবে। তবে চলে যাওয়া মানেই প্রস্থান নয়। মৃত্যু হয়তো বাহ্যিকভাবে আড়াল করে দিতে পারে তাদেরকে কিন্তু অন্তরের বোধ তো অপার ক্ষমতাবান। ঠিকই ফিরিয়ে আনবে প্রফেটকে।।

সাইফুল্লাহ ওমর নাসিফ

২৪.০৯.১৭

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!