মাহাথিরের নেতৃত্বে অর্থনৈতিক সংস্কারের আশায় গুড়ে বালি

Reading Time: 4 minutes


মালয়েশিয়ার নারীরা সমানাধিকারের দাবিতে কুয়ালালামপুরের রাস্তায় নামলে প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের ‘নয়া মালয়েশিয়ায়’ তাদেরকে পুলিশি তদন্তের মুখোমুখি হতে হয়। বিক্ষোভকারীরা দেশটির কুখ্যাত ‘রাষ্ট্রদ্রোহ আইন’ লঙ্ঘন করেছেন কিনা, তা খতিয়ে দেখার জন্য পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়। অথচ এ আইন ক্ষমতায় গেলে বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছিলেন মাহাথির। গত বছরের ঐতিহাসিক নির্বাচনে ক্ষমতাসীন পাকাতান হারাপান পার্টি শুধু এ প্রতিশ্রুতিই নয় বরং বেশ কয়েকটি প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করেছে। এতে ৯৩ বছর বয়সী মাহাথিরের আবার দায়িত্ব গ্রহণে যে আশাবাদের সঞ্চার হয়েছিল, সেখানে গুড়ে বালি দেখা দিয়েছ

সিতি কাসিম নামে ৫৬ বছর বয়সী একজন আইনজীবী ও রাজনৈতিক ধারাভাষ্যকার বলেন, পাকাতান হারাপান দল নেতৃত্বাধীন সরকারের হাতে অনেকে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। গত বছরের মে মাসে মাহাথিরকে ভোট দেয়া ৫৭ লাখ ৮০ হাজার ভোটারের একজন সিতি আরো বলেন, ‘পাকাতান হারাপান যদি তাদের সমর্থকদের না চিনে, তাহলে আগামী নির্বাচনে তারা হারবে।’

গত বছরের নির্বাচনে ২০০ পৃষ্ঠার ইশতেহারে রাখা প্রতিশ্রুতির বেশির ভাগই পূরণ করতে পারেনি পাকাতান হারাপান নেতৃত্বাধীন সরকার। ‘অ্যালায়েন্স অব হোপ’ বা ‘আশার জোট’ হিসেবে খ্যাত এ জোট মালয়েশিয়াকে একতা, সমতা ও সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যেতে পারবে কিনা, সে বিষয়ে অনেকেই সন্দেহ পোষণ করছেন।

নিজ দফতরে কর্মরত মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ
ছবি: রয়টার্স

মাহাথির বলছেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তার সরকার। বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ইশতেহার পাঁচ বছরের জন্য, এক বছরের জন্য নয়। আইনি প্রতিবন্ধকতার কারণে কিছু পরিবর্তন আনতে সময় লাগবে, যেমন কিছু পরিবর্তনের জন্য সংবিধানে সংশোধনী আবশ্যক। সেক্ষেত্রে সংসদে আমাদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন আবশ্যক। এজন্য শুধু সরকার নয় বিরোধী দলেরও সহায়তা আবশ্যক।

বৃহস্পতিবার জাতির উদ্দেশে দেয়া অন্য একটি ভাষণে মাহাথির বলেন, ‘এক বছরের মধ্যে সরকার অনেকগুলো দায়িত্ব পূরণের চেষ্টা চালিয়েছে। অবশ্যই আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা ও ভুলত্রুটি পরিলক্ষিত হয়েছে। সরকার সেগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে।’

ন্যূনতম অগ্রগতি

মালয়েশিয়ার মারদেকা সেন্টারের সাম্প্রতিক একটি জরিপে দেখা গেছে, মাহাথিরের গ্রহণযোগ্যতা ৭১ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে মার্চে ৪৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এদিকে জোট সরকারটির প্রতি সমর্থন ৭৯ শতাংশ থেকে কমে ৩৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াবিষয়ক বিশেষজ্ঞ লি মর্গেনবেসার বলেন, যে ন্যূনতম অগ্রগতি হয়েছে, তাতে নাগরিকদের অসন্তুষ্ট হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। পাকাতান হারাপান সরকারের গত এক বছর ছিল চরম হতাশার এবং সাম্প্রতিক জরিপগুলোয় তার প্রতিফলন ঘটেছে।

বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য এবং মালয়েশিয়ান চাইনিজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট উই কা সিয়ং বলেন, মূল প্রতিশ্রুতিগুলো থেকে সরে যাওয়ায় সরকারের প্রতি দেশের মানুষ নাখোশ।

গত মার্চে মালয়েশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশটির প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৯০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ দশমিক ৩০ শতাংশ-৪ দশমিক ৮০ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রলম্বিত বাণিজ্যযুদ্ধের ফলে মালয়েশিয়ার রফতানি সম্প্রসারণ আশানুরূপ না হওয়ায় প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস কমানো হয়েছে।

গত মঙ্গলবার অঞ্চলটির প্রথম কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে ব্যাংক নেগারা মালয়েশিয়া তাদের বেঞ্চমার্ক সুদের হার কমিয়েছে।

বিপরীত প্রতিক্রিয়ার শঙ্কা

সরকারের ৩০ শতাংশ পদ নারীদের দ্বারা পরিপূর্ণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল পাকাতান হারাপান। এছাড়া বাল্যবিবাহ বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারা, যা বর্তমান শরিয়া আইনে বৈধ। কিন্তু ধর্মীয় গোষ্ঠীর পাল্টা প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় সে প্রতিশ্রুতি পূরণে তেমন আগ্রহী মনে হচ্ছে না মাহাথির সরকারকে।

গত বছরের বিজয়ে মাহাথিরের সাবেক রাজনৈতিক দল দ্য ইউনাইটেড মালয়াজ ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের (ইউএমএনও) পেছনে কেতুয়ানান মেলায়ু ইসলাম নামে একটি ধর্মীয় মতাদর্শের কথা বলা হয়েছে। এ মতাদর্শের মাধ্যমে মুসলিম মালয়রা মালয়েশিয়ার অন্য জাতিগোষ্ঠীর চেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে প্রো-মালয় বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিরোধিতার পরিপ্রেক্ষিতে মৃত্যুদণ্ড বাতিল, দমনমূলক নিরাপত্তা আইন সংশোধন থেকে সরে এসেছে এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার চুক্তির দুটি ধারা সংশোধনের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয়েছে মাহাথির সরকারকে।

তবে ধর্মীয় ও জাতিগত বিভাজনের চেয়ে জীবনযাপনের ব্যয় বৃদ্ধি ঠেকাতে এবং গত কয়েক দশকের বিশাল ঋণের বোঝা থেকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার লাভে ব্যর্থতা মালয়েশিয়ার সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। 

ইউনিভার্সিটি অব মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষক আওয়াং আজমান আওয়াং পাওয়ি বলেন, চলতি বছরে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উন্নয়নে মাহাথিরের নেতৃত্ব কম সফল মনে হচ্ছে, যদিও এর আগে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে তার ওপরই অধিক আস্থা ছিল মালয়েশিয়ানদের। শিগগিরই প্রভাব ফেলতে সক্ষম, এমন অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণের মাধ্যমে সক্ষমতা দেখাতে হবে মাহাথির ও পাকাতান হারাপান সরকারকে।

কমছে জনসমর্থন

ক্ষমতাসীন জোটটির প্রতি যে জনসমর্থন কমে যাচ্ছে, তার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে সর্বশেষ একটি উপনির্বাচনে। গত মার্চে সেমেনিয়াহ আসনে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে পরাজিত হয়েছে পাকাতান হারাপান, যেটি এর আগে তাদের হাতে ছিল। শনিবার সান্দাকান নির্বাচনী আসনে উপনির্বাচনে নতুন আরেকটি পরীক্ষার মুখোমুখি হচ্ছে সরকার। যদি এ আসনও হারায়, তাহলে এক বছরের মাথায় স্পষ্ট হয়ে উঠবে পাকাতান হারাপান সরকারের প্রতি জনসমর্থনের ঢেউ আর আগের মতো নেই এবং মাহাথির নেতৃত্বাধীন এ সরকারের প্রতি সমর্থনে ভাটা দেখা দিয়েছে।

সরকারের অন্যান্য কর্মসূচি বাস্তবায়নে মাহাথির সক্ষম কিনা, সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলা শুরু করেছেন পর্যবেক্ষকরা।

কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন

গত এক বছরে মাহাথির সরকার কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপও গ্রহণ করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে বিতর্কিত পণ্য ও সেবা শুল্ক প্রত্যাহার, পেট্রলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা। এছাড়া দেশের প্রথম নারী প্রধান বিচারপতি হিসেবে তেংকু মাইমুন তুয়ান ম্যাটকে নিয়োগ, স্বাধীন গণমাধ্যম নিশ্চিতের লক্ষ্যে পূর্ববর্তী সরকারের আমলে কালো তালিকাভুক্ত সাংবাদিকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।

ক্ষমতাসীন জোটভুক্ত পিপলস জাস্টিস পার্টির সাংসদ নিক নাজমি নিক আহমাদ বলেন, ৬০ বছর পর প্রথম সরকার পরিবর্তন অনেক চ্যালেঞ্জিং একটি বিষয়। মালয়েশিয়ার বহুত্ববাদী চরিত্রের কারণে তা আরো জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে, কিন্তু তা সমাজের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে এবং মালয় গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে আশ্বস্ত করার জন্য যথেষ্ট নয়।

মালয়েশিয়ার নতুন সরকারের দুর্বল পারফরম্যান্সের জন্য আকারে-ইঙ্গিতে অনেকে মাহাথিরের দিকেই অভিযোগের তীর ছুড়ছেন, যাকে মালয়েশিয়ার পুরনো রাজনৈতিক এলিটদেরই প্রতিনিধি হিসেবে দেখছেন তারা। আইনজীবী ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার সিতি ব্লুমবার্গকে বলেন, আমার কাছে মনে হচ্ছে এখানে নতুন মুখ দরকার। আমাদের নতুন নেতৃত্ব দরকার; এমন নেতৃত্ব নয়, যারা অতীতের বাক্সপেটরা নিয়েই আছেন।

সূত্র: ব্লুমবার্গ, রয়টার্স

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!