মুগ্ধতায় নেপালে সাতদিন- পর্ব ১

Reading Time: 5 minutes

-ইমরান মাহফুজ

পাখি হয়ে ঘোরাই আমার স্বভাব। একটু ফুরসত পেলেই হাওয়া। গ্রাম কিংবা শহর কোথাও নেই দ্বিধা। সাধ্যের মধ্যে করি জীবনানন্দ ফেরি। অনুপ্রেরণা পাই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘মানস ভ্রমণ’ কবিতায়- “ইচ্ছে তো হয় সারাটা জীবন/এই পৃথিবীকে/এফোঁড়-ওফোঁড় করে যাই দুই পায়ে হেঁটে হেঁটে অথবা বিমানে”। আমিও গত ১৩ এপ্রিল দুপুরে বাংলাদেশ বিমানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘যেতে যেতে একলা পথে’ চলি। আর মনে করি কবিগুরু’র ঘুরে বেড়ানোর দারুণ নেশাকে। প্রচুর ভ্রমণ করেছেন বিশ্বকবি। ট্রেন, জাহাজ, নৌকায়, পালকি কিংবা গরুর গাড়িতে চড়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশে-বিদেশে।
আমরা যারা সৃজনসংসারে মানুষ, ভ্রমণ আমাদের মনোমন্দিরে সব সময় উঁকি দেয়। তবে বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের কাছে সহজ বিদেশ বলতে প্রথমেই যে নামগুলি মনে আসে ভারত, নেপাল ও ভুটান। নেপাল তাদের মধ্যে অন্যতম। ভারতীয়দের জন্য পাসপোর্ট-ভিসার কোনো ঝামেলা নেই, কেবল নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে সচিত্র কোনো পরিচয়পত্রই প্রয়োজন। পাসপোর্ট যেহেতু করা আছে আমিও বেছে নিলাম নেপালকে। তাছাড়া খরচও আয়ত্তের মধ্যে, যাকে বলে সাধ্যের মধ্যে সাধ পূরণ।

স্বাগতম ত্রিভুবন
পাসপোর্ট-টিকিট এসব কাগজ ঠিক থাকায় ঝামেলা হয়নি এয়ারপোর্টে প্রথমবার দেশের বাইরে যাওয়া, স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা এক্সাইটেড ছিলাম। সেই সাথে এয়ারপোর্ট পুলিশ জানতে চাইলো কেন যাচ্ছি, কার কাছে যাচ্ছি। স্বাভাবিকভাবে কথায়- শুভ কামনা জানায়। চেকিং শেষে প্লেনে উঠি। প্লেন ঠিক সময় থেকে ৩০ মিনিট দেরিতে ছাড়লো। একজন যাত্রী আসতে দেরি আসায় অপেক্ষায় কিছুটা সময় বিলম্ব। আর খেসারত দিতে হলো নেপাল ত্রিভুবন এয়ারপোর্টে প্লেন স্টে করতে ১ ঘণ্টা লেইট।

ঢাকা থেকে আকাশে ওড়ার কিছুক্ষণ পর দুপুরের খাবার দেওয়া হয় বাংলাদেশ বিমানের পক্ষ থেকে। খেয়ে জানালা দিয়ে বাহির তাকাতেই দেখলাম- এতো সুন্দর সব কিছু ছবির মতো। দেখতে দেখতে কাঠমুণ্ডুর কাছাকাছি এসে বিমানের ক্যাপ্টেন জানালো, নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে জ্যাম আছে। বাধ্য হয়ে আরও প্রায় ১ ঘণ্টা আকাশেই! ঢাকা থেকে যখন উড়াল দেই, তখন জানানো হয় যাত্রার সময় থেকে আনুমানিক দেড় ঘণ্টা। এখন তা দাঁড়াল প্রায় আড়াই ঘণ্টা।

অবশেষে পাখির মতো উড়ে নামলাম ত্রিভুবন এয়ারপোর্টে। নেমে একটা সেলফি নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতেই আশিক ভাই হাসি মুখে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা জানায়। ভাইসহ ভিসা-সংক্রান্ত কাজ সেরে বিমানবন্দর যখন বাইরে আসি, তখন সূর্য হেলে পড়ছে। হালকা ঠাণ্ডাও অনুভব করলাম। গরম পোশাক পরে আশিক ভাইয়ের অফিসের গাড়িতে উঠি। উদ্দেশ্য কাঠমুণ্ডুর থামেলসস্থ সার্ক সচিবালয়। ট্যাক্সিতে দুজনই বেশ আনন্দে দেশের খোঁজ-খবর নিতে দিতেই অফিসে আসি। সেই সাথে জানলাম- নেপালের সংস্কৃতিতে কারো সঙ্গে দেখা হলে প্রথমে প্রার্থনার ভঙ্গিতে হাত জোর করে নমস্তে বা নমস্কার বলতে হয়। যদি কোনো প্রবীণকে ঠিকানা জিজ্ঞেস করতে হয়- তবে নারীর ক্ষেত্রে দিদি এবং পুরুষের ক্ষেত্রে দাই সম্বোধন করতে হবে। নেপালে পায়ে ধরে সম্মান দেখানোর কোনো রীতি নেই।

ছবি: লেখক

নাগরকোট
বেলা প্রায় তখন ৪টা। দুপুরের খাবার খেলাম। মিনাশিক ভাবি খুবই চমৎকার রান্না করেন। এমন ভোজে প্রায় সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। বেলা গড়াতে আমরা প্রস্তুতি নিলাম পহেলা বৈশাখ উৎসব অংশগ্রহণ করতে নাগরকোটে যাওয়ার। বলে রাখা ভালো- আমাদের দেশের বাংলাসনের সাথে তাদের দেশেরও মিল আছে। ফলে আনন্দ নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সে জন্যে আমরা যথারীতি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে নাগরকোটের উদ্দেশ্যে মাইক্রোতে রওয়ানা হলাম।
২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত স্থাপনা দেখতে দেখতে কাঠমুন্ডু শহর পার হতেই সূর্য সেদিনের মতো বিদায় জানালো। আমরা হাওয়ায় উড়ছি। মাঝে মাঝে রাস্তার অবস্থা দেখে চক্ষু চড়কগাছ। এইভাবে গাড়ি চললো প্রায় ৩ ঘন্টা। কিন্তু তবুও গন্তব্যে পৌঁছতে পারলাম না। নির্ধারিত হোটেল খুঁজতে খুঁজতে হয়রান। এখানকার মানুষ কেউ কারো খোঁজ রাখে না। প্রত্যেকে নিজের কাজে ব্যস্ত। ব্যস্ততা কিছুটা নগর ঢাকার মতো। কিন্তু আবেগহীন তল্লাটের বাংলার চিরচেনা প্রকৃতির ন্যায় চারদিকে সবুজে ঘেরা পাহাড়, সাথে চুলকালো অন্ধকার।

নাগরকোট যাবার পুরোটা পথ পাহাড়ি আঁকাবাঁকা আর সবুজে ঘেরা। মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগলাম। কিছুটা মিল পেলাম আমাদের বান্দরবান- এর নীলগিরি যাবার পথের সাথে। সারি সারি উঁচু পাহাড়ের মাঝখানে আঁকাবাঁকা পথ। একপাশে বাড়ি অন্য পাশে পাহাড় এমন দৃশ্যে চমৎকার লাগছিল। পাহাড় কেটে কেটে বাড়ি নিমার্ণ তবে গুছানো। দারুণ এ পারস্পরিক মিল, পাহাড়, পথ আর লেকের মাঝখানে ১ বার হোটেলে থামলো কিছুক্ষণের জন্য। দোকানগুলোতে নেপালি জিনিসপত্রের চেয়ে ইন্ডিয়ান বেশী লক্ষ্য করার মতো। তবে বাংলাদেশের পাওয়া যায় প্রাণের প্রায় সকল পণ্য। প্রাণ চিপস নিয়ে আপতত চললাম।
দীর্ঘ সময় পার হয়েও হোটেল না পাওয়ায় ভয় ভয় লাগছে। অবশেষে দুই নেপালি জোয়ানের সহযোগীতায় ‘নাগরকোট হিলসাইড ভিলেজ রিসোর্টে’ আসলাম। আর হোটেল দেখেই আমাদের কি আনন্দ! মালসামান রেখে ফ্রেশ হয় হলাম। প্রায় সারারাত অনেক মজা আর বিভিন্ন স্বাদের খাবারে ব্যাপক কেটেছে বছরের শুরুটা। হোটেল থেকে নিচে তাকাতেই পাহাড়ের মাঝে মাঝে অচেনা অনেক দারুণ গাছের সমাহার। পুরো জায়গাটা মনটাকে মাতোয়ারার করে রাখল। প্রাকৃতিক পরিবেশ অনন্য। ফ্রেমে আটকে রাখার লোভ কে সামলাতে পারে! অনুভব করার চেষ্টা করলাম মা মাটি মানুষকে।

আমরা অনেক উচ্চতায় উঠে গেছি, মোবাইল এ্যাপসের মাধ্যমে জানলাম প্রায় ২৮০০ ফিট উপরে। ওখান থেকে চারপাশের ভিউ দেখে রেজাভাইসহ বলে উঠলাম ‘ওয়াও’। হিমালয়ের কিছু চূড়া যেমন- মানাস্লু, গণেশ হিমেল, লেঙ্গান, চোবা ভাম্রি গৌরীশঙ্কর নাগরকোট থেকে স্পষ্ট ভাবে দেখা যায়। আসলেই পৃথিবী অনেক সুন্দর। পাখি হলেও টের পাওয়া যায়।

ছবি: লেখক

আমরা ভোর-রাতেই গাড়িতে করে চলে গেলাম পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে। সূর্য ওঠার সময় অপার্থিব সোনালি আভা যখন প্রকৃতি আর মন ছুঁয়ে যায়, তখন সত্যিই মনে প্রশ্ন ওঠে- যাপিত জীবনে এতো এতো হিংসা বিদ্বেষ কেন করি!

চিতওয়ান ন্যাশনাল পার্ক
একরাত দুইদিন পর বাসায় এসে ভোর ৬টার আগেই চলে গেলাম রত্নপার্ক হয়ে থামেলস্থ ট্যুরিস্ট বাস স্পটে। বাস ছাড়বে ৬.৩০-এ। আমরা যাবো নেপালের দক্ষিণাঞ্চলের চিতওয়ান ন্যাশনাল পার্কে। সেখানে দেখা মিলবে রয়াল বেঙ্গল টাইগার এবং এক শিং বিশিষ্ট বিরল প্রজাতির গ-ারসহ নানান ধরনের প্রাণী। অদ্ভুত এক রোমান্সে সরাসরি দেখা যাবে ৩৬০ বর্গমাইলের চিতওয়ান ন্যাশনাল পার্ক। এটি ত্রিশূলী নদীকে বাঁ দিকে রেখে সবুজ পাহাড়ের শরীর বেয়ে কাঠমান্ডু থেকে নামতে নামতে প্রায় মাটির কাছে আসছে। নেপালের প্রথম এই ন্যাশনাল পার্ক ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত।
যেতে যেতে প্রায় দুপুর ১টা বেজে গেলো। সবুজ অরণ্যে বাস স্টপেজ। যেন একখণ্ড বাংলাদেশ। এখানকার একটা বিশেষত্ব হচ্ছে- মূল শহরের বাইরে যানবাহন রাখার স্থান, আর এতে পর্যটকদের গাড়ির শব্দে কোনো রকম বিরক্তি আসে না। তাছাড়া নেপালে তো গাড়ির হর্ণ দেওয়ার নিয়মও নেই। আমরা হোটেলের গাড়ি করে হাওয়ায় নাচতে নাচতে চলে গেলাম চিতওয়ানের বুকে।

বিকালে লেকের ধারে ধারে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ-প্রাণীর পরিচয় দিলো গাইড। এখানকার প্রত্যেকটি বিষয় এমন গোছানো যা আমাদের গ্রহণীয়- কিভাবে সবুজ বনায়নসহ প্রকৃত সৌন্দর্যকে ইকো টুরিজমের আওতায় আনা যায়। সত্যি ভাবনার। চারদিক মুগ্ধকর সবুজ, আর তাছাড়া নেপাল মানেই এক ধরনের রহস্যময়তা। যেভাবে মিহিকুয়াশার চাদর এখানকার মখমলে পাহাড়ের শরীরকে কখনও আড়ালে, কখনও গোপনে, কখনও চোখের সামনে এনে ফেলে, ঠিক সেই রহস্যময়তাই যেন ছেয়ে আছে সারা কুমারী মাতার শরীর জুড়ে!

চিতওয়ান ন্যাশনাল পার্কে লেখক। ছবি: লেখক

পরদিন সকাল আটটায় বের হলাম। ‘জঙ্গলের হৃদয়ে’ হাতি আর হাতি আর এতো হাতির কথা শুনে চমকে উঠার কিছু নেই। কারণ এই জঙ্গলের একমাত্র বাহন এই হাতিই। হাতি সম্পর্কে অনেক কিছু জানা গেছে গাইডের আলোচনায়। এবার শুরু আশিক ভাইয়ের পরিবারসহ ‘জঙ্গল সাফারি’। হাতির পিঠে ঘন জঙ্গলে দু’ঘণ্টার অ্যাডভেঞ্চার। চিতওয়ানের জঙ্গলে মাছির মতো ভিড় গণ্ডার আর হরিণের। গণ্ডা কয়েক গুন্ডা টাইপের গণ্ডার আর শ’য়ের কাছাকাছি হরিণের দেখা মিললো। ওখানে পরিচয় হলো এক ভারতীয় পরিবারের সাথে। বেশ মজায় সময়টা কাটলো। ‘রাপ্তি’ নদীতে গোসল করলাম জলের অনুভবে। দুপুরের খাবার বেশ উপভাগ্য মনেই খেলাম।

তারপর ক্যানো রাইডিং। ‘রাপ্তি’ নদীতে জঙ্গলের গা ঘেঁষে ক্যানোয় চরে বয়ে যাওয়া। জঙ্গলে পাখি দেখার এ এক সুবর্ণ সুযোগ। বহু প্রজাতির পাখির মিলন মেলা এই অঞ্চলে। মাঝে মাঝে মিলে দেখা যায় কুমিরের। সেই সাথে চিতওয়ানেই মিলেছে পৃথিবীর অন্যতম হাতি প্রজননকেন্দ্র বলে রাখা ভালো পৃথিবীতে হাতি প্রজনন কেন্দ্র একেবারেই হাতে গোনা।

এমন মজার দৃশ্যে চিতওয়ান ন্যাশনাল পার্কে থেকে যেতে ইচ্ছা করবে ঘন্টার পর ঘন্টা। উল্লেখ্য যে, এই পার্কটি হল পর্যটকদের জন্য নেপালের প্রধান আকর্ষণ এবং তা ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকার অন্তর্ভূক্ত। দুই হাজার আট সালের এক হিসেব অনুযায়ী, চিতওয়ানে দেখা যায় চারশ আটটি গন্ডার।

লেখক: কবি, গবেষক ও সম্পাদক, কালের ধ্বনি

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!