রক্তস্নাত পলাশীর নির্মম ইতিহাস

Reading Time: 2 minutes

পলাশীর রক্তস্নাত ইতিহাস কোন রক্তরাঙা পলাশ প্রসূন নয়, এটা ঘুমপাড়ানী মাসি-পিসির ছেলেভুলানো গানও নয়, নয় কোন আরব্য রজনীর অলীক উপন্যাস, বরং এটি এক ভাগ্যবিড়ম্বিত নবাবের পতনের কাহিনী। পলাশীর আম্রকানন থেকে যেদিন বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হল সেদিন থেকে ইংরেজদের একচেটিয়া রাজত্ব শুরু হল, আর শুরু হল এ দেশের ভুঁইফোঁড় জমিদারদের ইংরেজ প্রীতি। এর খেসারত বাঙালি জাতিকে বারবার দিতে হয়েছে। ইংরেজ বাঙালি জাতিকে অনেক দিয়েছে কিন্তু নিয়েছে এর লক্ষ-কোটি গুণ বেশি।

ইংরেজ বাহাদুররা আমাদেরকে শিখিয়েছে কিভাবে অন্যের পা ধরে থাকতে হয়, তাইতো বাঙালিরা ইংরেজ শাসনামল থেকে শুধু কেরানীর চাকুরী পেতে শুরু করেছিল । ইংরেজদের সাথে আপোষ করে বাঙালি জমিদার বাবুরা ইংরেজদের পাপোশে পরিণত হল। নীতির মুখে বোমা মেরে তারা তাদের বিশাল ধামা পাতলো ইংরেজদের কাছে, ঠিক ভিখারির মত। সাপের মুখেও তারা চুমো দিল আবার বাঘের মুখেও। তাই তারা বাবুদের কাছে জলে ধোয়া তুলসি পাতা বনে গেল। আর যারা ইংরেজদের বিরুদ্ধে লাঠি তুলেছিল তারা আজ ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। ইংরেজ বাবুদের কাছে বাহবা পাওয়া এদেশের পা চাটা কুকুরগুলো ইতিহাসের মজ্জা চিবিয়ে খেয়েছে। তাইতো ঐতিহাসিকরা লিখেছেন তাদের বিজয়গাঁথা, পরিয়েছেন বিজয়মাল্য। ইতিহাস আমাদেরকে এটাও শিখিয়েছে যে পাপ মানুষকে ক্ষমা করেনা। সে তার ষোল আনা প্রাপ্য চুকিয়ে নেয়।

নবাব সিরাজকে বাংলার মসনদ থেকে যে কুচক্রী মহল উৎখাত করে দিয়ে নিজেদেরকে বহাল করেছিল তারা একদিকে মানুষের কাছে হয়েছে ঘৃণিত আবার অন্যদিকে ইতিহাসের যুপকাষ্ঠে হয়েছে বলি। মীরজাফরের শেষ জীবন যথেষ্ট সুখের হয়নি। এমনিতেই ব্রিটিশরা তাকে টিস্যু পেপারের মত ব্যবহার করেছে তারপর আবার তার বিশ্বাসঘাতকতার পুরস্কার স্বরূপ তাকে নিজেদের সহজ শিকারে পরিণত করেছে। এই বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর এতটাই ঘৃণ্য এক নাম যে আজকাল কেউ তার সন্তানের নাম পর্যন্ত মীরজাফর রাখতে চায়না। অথচ তার নাম ছিল মীর জাফর আলী খান। আজকাল কোন বাক্তি কোন টাউটবাজ মানুষকে দেখলে তাকে মীরজাফর কিংবা ব্রিটিশ বলে আখ্যা দেয়। এই ধারণা মানুষের মনে হঠাৎ করে উড়ে এসে জুড়ে বসেনি বরং তা বিশ্বাস ঘাতকতার ইতিহাসের বহিঃপ্রকাশ।

মীরজাফর কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। আর তার পুত্র মীরন বজ্রাঘাতে মারা যায়। উমিচাঁদ উন্মাদ ও ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাতর হয়ে মারা যায়। মহারাজ নন্দকুমার মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসিতে মারা যায়। জগৎশেঠ ও মহারাজ স্বরূপচাঁদ গঙ্গার জলে ডুবে মারা যায়। মুহম্মদী বেগ কূপে পড়ে গিয়ে মারা যায়। রায়দুর্লভ জেলখানায় থেকে অনশন অর্ধাশনে মারা যায়। দুর্লভরাম নিঃস্ব অসহায়ের মত নাস্তানাবুদ হয়ে সর্বস্বান্ত হয়। লর্ড ক্লাইভ ইংরেজদের হাতে গড়া এক লর্ড। এ লাট সাহেবের মৃত্যুও হয় খুব করুণ অবস্থায়। এই রক্তপিপাসু লর্ডক্লাইভ আত্মহত্যা করে। তার আত্মহত্যা করার কারণ সকলের জানা দরকার।

ভারতের অর্থনৈতিক পতনের মূলহোতা শোষক ক্লাইভ ভারত ছেড়ে যাওয়ার আগে তৎকালীন সময়ে পেয়েছিলেন দুই লক্ষ আশি হাজার(2,80,000/-) টাকা আর হাতের পুতুল মীরজাফর তাকে দিতে বাধ্য হয়েছিল আরও এক লক্ষ ষাট হাজার(1,60,000/-) টাকা। মেম্বার হিসেবে তার পকেটে আরও দুই লাখ (2,00,000/-) টাকা জমা পড়েছিল আর সেনাপতির যোগ্যতা আর ষড়যন্ত্রের পুরস্কার স্বরূপ পেয়েছিল আরও এক লাখ ষাট হাজার(1,60,000/-) টাকা। যখন ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে তার ত্রিশটি নৌকা ছেড়ে যাচ্ছিল তখন তা ছিল ধনরত্ন, মণি-মাণিক্য, সোনা ও রূপায় ভর্তি। দেশে ফেরার পর সে এক বিরাট মামলার আসামী হিসেবে বিবেচিত হয়। বিষয়টি এমন ছিল না যে, সে ভারতের মানুষকে শাসন-শোষণ করে কোটি কোটি টাকা লুটে এনেছে, বরং তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ ছিল এমন যে সে ব্রিটিশ সরকারকে যা দেওয়ার কথা ছিল তা দিতে চায়নি। তাই আসামী হওয়ার অপমানে, ক্ষোভে, বিস্বাদে সে আত্মহত্যা করেছিল। এটাই একজন শোষকের যোগ্য পুরস্কার।

কই ঐতিহাসিকরা তো এই ইতিহাস ফুটিয়ে তুলতে চাননা? কেন? কারণ মানুষ সত্য জেনে যাবে! ইতিহাস যে জাতির কাছে অস্পষ্ট সে জাতির মত অভাগা আর কেউ নয়। জাতি ততদিন নির্বোধ থেকেই যাবে যতদিন জাতির সত্য ইতিহাস উন্মোচিত না হবে।আজ জাতি ব্যাঙের মত ঘুমিয়ে গেছে, পঠন-পাঠন থেকে জাতি শত শত আলোকবর্ষ দূরে অবস্থান করছে। তাই এ জাতির কল্যাণ আজ ধূলায় ভূলুণ্ঠিত ও দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত।

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!