রোহিঙ্গা প্রশ্নে মিয়ানমার এবং বাংলাদেশ সম্পর্কের ইতিহাস

Reading Time: 3 minutes

রোহিঙ্গা, এই শব্দটিই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সব থেকে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে এখন। কেউ শব্দটিকে বিশ্লেষণ করছেন সাম্প্রদায়িক ধরে, কেউবা নিয়ে যাচ্ছেন মানবতার বাইরে। যেন বর্তমান বিশ্বের সকল ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাজ এই রোহিঙ্গা ছাড়া চলছেনা। এত কিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে যাদের বাস তারাই হচ্ছে আবাসহীন। সামান্যতম মানবিক সহায়তার আশায় পাড়ি জমাচ্ছে পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন দেশে। তবে রোহিঙ্গাদের প্রথম এবং প্রিয়! পছন্দ সবুজ বাংলাদেশ। কিসের এত টান? কিই বা তাদের উদ্দেশ্য? আর কেনই বা তারা শরনার্থী হতে বাংলাদেশকেই বেছে নেয় বারবার? রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নিয়ে পৃথিবী ব‍্যাপি বয়ে চলা এই শীতল সংকট, এর অতীত ইতিহাস এবং সমস‍্যা সমাধান প্রকল্প সামনে রেখে গত ২৩শে সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ স্টাডি ফোরাম “Rohingya Genocide : Unbearable Past & Uncertain Future” শিরোনামে আয়োজন করেছিল ১০৫ তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচার।

রোহিঙ্গা জাতির ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করছেন ড. কাজল রশীদ শাহীন

এই পাবলিক লেকচারে প্রথম আলোচক হিসেবে রোহিঙ্গা প্রশ্নে মিয়ানমার এবং বাংলাদেশ সম্পর্কের অতীত থেকে বর্তমান ইতিহাসের উপর একটি তাত্ত্বিক আলোচনা তুলে ধরেন স্বনামধন্য লেখক, গবেষক এবং সাংবাদিক জনাব ড. কাজল রশীদ শাহীন।

জনাব কাজল রশীদ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অতীত ইতিহাস পর্যালোচনার শুরুতেই উল্লেখ করেন “রোহিঙ্গা ইস‍্যুটি চলমান সময়ে সৃষ্ট কোন আধুনিক হিসেব নিকেশ নয়। বরং এর সূচনা হয়েছিল ব্রিটিশ শাসনামলেই। ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ব‍্যর্থ হওয়ার পর বার্মাকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং ১৯৩৭ সালে পুনরায় বার্মাকে ভারত থেকে আলাদা করে দেয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির সময়কালে আরাকান অংশ চেয়ে ছিলো পাকিস্তান অংশের সাথে যুক্ত হতে”। এর কারন হিসেবে ড. কাজল রশীদ শাহীন বলেন- আরাকান ছিলো পাহাড় ঘেরা এমন একটি রাজ‍্য যার সাথে বার্মার অন‍্য অঞ্চলগুলোর সাথে স্থল পথের তেমন কোন যোগাযোগের ব‍্যবস্থা ছিলোনা। অপরদিকে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে আরাকানের মানুষের ছিল অবাধ চলাফেরা। তবে দেশ ভাগের সময় জিন্নাহ সাহেব তাদের প্রস্তাবে রাজি হননি।

আলোচনায় উপস্থিত শ্রোতাদের একাংশ

পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালে বার্মা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। এর পর থেকেই আরাকান অঞ্চলে মুসলমানদের একটি জোট গড়ে ওঠে এবং তারা নিজেদের স্বাধীনতার জন‍্য সংগ্রাম চালাতে থাকে। তাদের এই বিদ্রোহ থামাতে আরাকানে সেনা শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬২ সালে। আর ১৯৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাথে তাদের স্বাভাবিক যোগাযোগ ব‍্যহত হয়। আর এই সুযোগে বার্মিজ সরকার আরাকানবাসী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর টুটি চেপে ধরে। একারনে ঐ অঞ্চলের জনগন ১৯৭৭ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সংখ্যায় বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করে। তবে ড. শাহীন বলেন- “রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর এমন শরনার্থী সংকটে পরিনত হবার একটি বিশেষ কারন, বার্মা কখনো হর্ষবর্ধনের মত রাজা পায়নি, যারা সেখানে শাসনের দায়িত্ব পালন করতেন তারা ছিলেন সাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী। বার্মায় শুরু থেকেই সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের ইতিহাস সবারই জানা।”

উপস্থিত শ্রোতাদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন ড. কাজল রশীদ শাহীন

একটি দেশ বা জাতির ইতিহাসে ভৌগোলিক অবস্থান এবং তার বৈচিত্র্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ভৌগোলিক ইতিহাস আলোচনায় আলোচক বলেন- আরাকানের ভৌগলিক এলাকা জুড়ে রয়েছে খনিজসম্পদের একটি বড় ভান্ডার। আর এই সম্পদের মোহের কারনেই বার্মার পার্শ্ববর্তী দেশগুলো রোহিঙ্গা ইস‍্যুতে মানবতার উর্ধ্বে এসে রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করবার চেষ্টায় সদা ব‍্যস্ত থাকে।

আলোচনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত শ্রোতাদের মতামত এবং প্রশ্ন উত্তর পর্বে ‘রোহিঙ্গারা বাঙালি কিনা?’ এই প্রশ্নের জবাবে জনাব কাজল রশীদ শাহীন বলেন- “কেবলমাত্র ভাষাগত মিল কিংবা ধর্মের ভিত্তিতে একটি জাতিকে সনাক্ত করা যায় না। সুতরাং সুচি সরকার রোহিঙ্গাদের কে যে যুক্তিতে বাঙালি বলছে তা কোন ভাবেই সঠিক নয় বরং হাস‍্যকর। রোহিঙ্গা সমস্যার সূচনা হয়েছে সুদূর অতীতে আর অং সান সুচি রোহিঙ্গাদের জাতীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ২০১২ সালের দিকে। সুতরাং এটি তার কূট কৌশলের একটি সুস্পষ্ট নমুনা ছাড়া আর কিছুই নয়।”

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!