সায়েন্স টক – ০৩ : “ভিন্ন গ্রুপের রক্ত সঞ্চালন জটিলতা”

Reading Time: 2 minutes

১৯০১ সালে কার্ল ল্যান্ডস্টেইনার (Karl Landsteiner) মানুষের লোহিত রক্তকণিকায় বিদ্যামান বিভিন্ন অ্যান্টিজেনের উপস্থিতির ভিত্তিতে A, B, AB, এবং O এই চারটি ব্লাড গ্রুপ নির্ধারণ করেন। তখন পর্যন্ত এই রক্ত গ্রুপ গুলোর কোন পজিটিভ বা নেগেটিভ বিভাগ নির্ণয় করা হয়নি। এ সময়ে শুধু রক্তের গ্রুপ মিলিয়ে রক্তের আদান-প্রদান করা হত। ফলে দেখা যেত গ্রহীতাকে রক্ত দেবার পরেও তার চিকিৎসা ফলদায়ক হচ্ছে না।

পরবর্তীতে ১৯৪০ সালে কার্ল ল্যান্ডস্টেইনার এবং উইনার (Karl Landsteiner & Weiner) লোহিত রক্তকণিকার প্লাজমা মেমব্রেনে Rh ফ্যাক্টরের উপস্থিতি-অনুপস্থিতির ভিত্তিতে পূর্বের রক্তের গ্রুপ গুলোকে আবার শ্রেনীবিন্যাস করেন। Rh ফ্যাক্টর বিশিষ্ট রক্তকে Rh+ (Rh পজেটিভ) এবং Rh ফ্যাক্টরবিহীন রক্তকে Rh- (Rh নেগেটিভ) হিসেবে অভিহিত করা হয়।

রক্ত গ্রুপ গুলোর পজেটিভিটি ও নেগেটিভিটি নির্ধারিত হওয়ার পর চিকিৎসা বিজ্ঞানে রক্ত আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাপক সফলতা পরিলক্ষিত হয়। রক্ত আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে গ্রুপ ভিন্নতার কারনে কী কী জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে তার সংক্ষিপ্ত আলোচনা তুলে ধরবার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা করছি মাত্র।

একজন Rh- রক্তবিশিষ্ট ব্যক্তির দেহে Rh+ বিশিষ্ট রক্ত প্রদান করলে প্রথমবার গ্রহীতার দেহে কোন প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়না। তবে গ্রহীতার রক্তে ক্রমশ Rh+  অ্যান্টিজেনের বিপরীত অ্যান্টিবডি উৎপন্ন হয়। গ্রহীতা যদি দ্বিতীয়বার পুনরায় Rh+  রক্ত গ্রহন করে তাহলে গ্রহীতার দেহে সৃষ্টি হওয়া ঐ অ্যান্টিবডি নতুন প্রবেশকৃত Rh+ রক্তের লোহিত কণিকাকে জমাট বাধিয়ে পিন্ডে পরিনত করে। ফলে গ্রহীতার মৃত্যুর সম্ভাবনা থাকে।

তবে Rh ফ্যাক্টরের সবচেয়ে বেশি এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পরিলক্ষিত হয় গর্ভাবস্থায়। একজন Rh- (Rh নেগেটিভ) মহিলার সাথে একজন Rh+ (Rh পজেটিভ)পুরুষের বিয়ে হলে তাদের প্রথম সন্তানের রক্ত হবে Rh+ (Rh পজেটিভ)। এটিই জীববিজ্ঞানের প্রকটতার নিয়ম। যেহেতু সন্তানের রক্ত হবে Rh+, সেহেতু ভ্রুনাবস্থায় সন্তানের Rh+ ফ্যাক্টরযুক্ত লোহিত কণিকা অমরার মাধ্যমে মায়ের রক্তে পৌছাবে,  ফলে মায়ের Rh- রক্তের মধ্যে Rh+ এর বিপরীত অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে জমা থাকে। পরবর্তীতে এই সৃষ্ট অ্যান্টিবডি মায়ের দেহ থেকে ভ্রুনের দেহে প্রবেশ করলে ভ্রুনের লোহিত কণিকা ধ্বংস করে, ভ্রুন বিনষ্ট হয় এবং গর্ভপাত ঘটে। এই অবস্থাকে বলা হয় এরিথ্রোব্লাস্টোসিস ফিটালিস (erythroblastosis foetalis).

যেহেতু Rh+ বিরোধী অ্যান্টিবডি মাতৃদেহে খুব ধীর গতিতে উৎপন্ন হয়, সেহেতু প্রথম সন্তানের কোন ক্ষতি হয় না। কিন্তু পরবর্তী গর্ভধারণ থেকেই বিপত্তি শুরু হয়। ঠিক একারনেই বিয়ের আগে হবু বর-কনের রক্ত পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত এবং একই Rh ফ্যাক্টরভুক্ত (Rh+, Rh+ অথবা Rh-, Rh-) দম্পতি হওয়া উচিত। তবে খুশির কথা এই যে মাতার রক্ত যদি Rh+ (Rh পজেটিভ) ফ্যাক্টর বিশিষ্ট হয় তাহলে এধরনের সমস্যার সম্ভাবনা খুবই কম।

(**নিষেকের ১২ সপ্তাহ পরে অমরা গঠিত হয়। আর এই অমরার মাধ্যমেই ভ্রুন এবং মাতৃদেহের মধ্যে রক্ত, পুষ্টিদ্রব্য, স্নেহ, গ্লাইকোজেন, ওষুধ ও বিভিন্ন রোগ-জীবানু পরিবাহিত হয়।)

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!