সেনেকার পরিচয় ও সময়ের মূল্য নিয়ে অমূল্য বাণী

Reading Time: 3 minutes

সেনেকা (৫ খ্রি.পূ.-৬৫ খ্রি.) ছিলেন একজন রোমান দার্শনিক। স্পেনের কর্ডোভাতে জন্মগ্রহণ করলেও খুব অল্প বয়সে পরিবারের সাথে রোমে চলে আসেন। তর্কশাস্ত্র ও আইন বিষয়ে পড়াশুনা করেন। মায়ের প্রভাবে দর্শনের জগতে প্রবেশ করেন। স্টোয়িকবাদের সাথে পরিচিত হন এবং শক্ত অনুসারী এবং প্রচারকে পরিণত হন। ছিলেন রোমান সম্রাট নীরুর গৃহশিক্ষক এবং পরবর্তীতে উপদেষ্টা। রাজনীতির রেষারেষি থেকে দূরে থেকে দর্শনের জগতে কাজ করার জন্য উৎসাহিত করার চেষ্টা চালিয়েছিলেন রোমান সম্রাট নীরুর উপর। বড় হওয়ার সাথে সাথে নীরু তার শিক্ষক সেনেকার প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে যান। সম্রাট নীরুর মধ্যে দার্শনিকতা বা দার্শনিক রাজার গুণাবলী ছাড়া অন্য অনেক কিছুই ছিল। খুব স্বাভাবিকভাবেই সেনেকার স্টোয়িক দর্শন দ্বারা বেশি প্রভাবিত হননি।

OLYMPUS DIGITAL CAMERA

রোমান সাম্রাজ্যে বিভিন্ন বড় পদে দায়িত্ব পালন করে অবসরে যান। তার জীবনের শেষ তিন বছর নিজের দর্শনকে গুছিয়ে শেষ করে যান। রোমান সম্রাট নীরুকে হত্যার লক্ষ্যে পিসোনিয়ান ষড়যন্ত্র হয় ৬৫ খ্রি.। সেই ব্যর্থ ষড়যন্ত্রে সেনেকার নামও চলে আসে। তবে বেশিরভাগ গবেষকদেরই মতামত সেনেকা এতে জড়িত ছিলেন না। কিন্তু কি আর করা! রাজরোষের শিকার হলেন সেনেকা। এবং তাকে মৃত্যুদণ্ড দিলো তারই ছাত্র সম্রাট নীরু। আরেকটি সক্রেতেসীয় কাহিনীর শুরু। সেনেকাকে নিজের জীবন নিজে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলো। সেনেকা তার রগগুলো কেটে দিলেন যাতে রক্ত ফুরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে মারা যেতে পারেন। বুড়ো বয়সের কারণে হয়তো রক্ত ধীরে ধীরে বের হচ্ছিল। এজন্য সক্রেতিসের মতো বিষও পান করেছিলেন সেনেকা। বিষটি দুর্বল হওয়ার কারণে সেটাও ধীরে ধীরে কাজ করছিলো। অবশেষে দ্রুত মৃত্যুর জন্য উষ্ণ পানির টাবে নামেন। আশেপাশে ভক্ত ও শিষ্য পরিবেষ্টিত হয়ে সেনেকা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

সেনেকার বেশিরভাগ নাটকই ট্রাজেডি। বিখ্যাত নাটকগুলো হচ্ছে: দ্য ম্যাডনেস অব হারকিউলিস, দ্য ট্রোজান ওইমেন, দ্য ফিনিসিয়ান ওইমেন, আগামেমনন, ঈদিপাস, মিদিয়া।

চিঠি ও প্রবন্ধ আকারে অনেকগুলো গদ্য লিখেন যার প্রতিটিতেই জীবনের গভীর উপলব্ধি অর্জনের মশলা পাওয়া যাবে। পলিনাস নামে একজন রোমান রাজকর্মচারীকে উদ্দেশ্য করে ‘অন দ্য শর্টনেস অব লাইফ’ লিখেছিলেন। সময়টা ছিল ৪৯ খ্রিস্টাব্দ। ল্যাটিন ভাষায় বইটির শিরোনাম ছিল De Brevitate Vitæ (দে ব্রেভিতেত ভাইতা)।

অন দ্য শর্টনেস অব লাইফ বা জীবন ছোট নয় থেকে খানিক মনি রত্ন:

প্রত্যেকেই যেন এক তাড়ার মধ্যে আছে; ভবিষ্যতের কাছে কামনা এবং বর্তমানকে নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে থাকে।

কিন্তু যে তার পুরো সময়টা নিজের জন্য বরাদ্দ রাখে, যে মনে করে প্রতিটি দিনই তার শেষ দিন হতে পারে সে কখনো অহেতুক কামনার মধ্যে বাঁচে না বা আগামীকাল নিয়ে অহেতুক ভীতির মধ্যে। কোন ঘন্টা তার জন্য কি নতুন আনন্দ নিয়ে আসতে পারে? এগুলো তো জানা হয়ে গেছে, একেবারে ভরপুর উপভোগ করা হয়েছে।

কারো ধূসর চুল বা কুচকানো চামড়া দেখে ভাবার উপায় নেই সে অনেকদিন বেঁচেছে। সে আসলে দীর্ঘদিন টিকে ছিল। বন্দর থেকে জাহাজে উঠার পর অল্পক্ষণ পরই কোন নাবিক যদি ঝড়ের কবলে পড়ে এবং উদ্দাম সমুদ্রে এদিক ওদিক লাফালাফি করে, বৃত্তাকারে একই জায়গায় ঘুরেফিরে তাকে তো বলা যাবে না অনেক পথ ভ্রমণ করেছে।  সে অনেক অভিযান করেনি, এদিক ওদিক ঘুরেছে মাত্র।

And so there is no reason for you to think that any man has lived long because he has grey hairs or wrinkles; he has not lived long—he has existed long.

পৃথিবীতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলো নিয়ে মানুষ তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। কারণ এগুলো চোখের কোণায় ধরা পড়ে না। এজন্য এটাকে সস্তা জিনিস হিসেবে গুণা হয়ে থাকে যেন এর কোন মূল্যই নেই।

এই যে তারা সময়কে কোন মূল্য দেয় না, এটা দেদারছে বিলিয়ে দেয়। আবার তারাই যখন অসুস্থ হয় বা তাদেরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় তখন ডাক্তারের পায়ে পড়ে, বিচারকের কাছে প্রাণভিক্ষা চায় এবং সকল অর্জিত সম্পদের বিনিময়ে হলেও আরেকটু সময় বেশি বাঁচতে চায়। মানুষের অনুভূতির এই হলো দ্বিচারিতা।

luciusannaeusseneca100585

Spread the love

Related Posts

One Response

Add Comment

error: Content is protected !!