অঞ্চল পর্যালোচনা : হাওরাঞ্চলের ইতিহাস (২য় পর্ব)

Reading Time: 4 minutes

হাওরাঞ্চলে জনবসতি কখন গড়ে উঠেছে তার সুস্পষ্ট প্রমাণ কোথাও পাওয়া যায়নি। অঞ্চলটি দুর্গম, বন-জঙ্গলাকীর্ণ ও বৈরী প্রাকৃতিক পরিবেশের ছিল বলে এখানে স্বাভাবিক জনবসতি গড়ে ওঠেনি। এখনও বাংলাদেশের স্বল্প জনবসতি অঞ্চলগুলোর মাঝে এটি একটি। কোনো এক সময়ে এ অঞ্চলে হিংস্র ও বিপজ্জনক প্রাণীর বসবাস ছিল বলে খুব সহজে কেউ এখানে বসবাস করতে সাহস করত না। তবে এটি ধারণা করা চলে যে মূল ভূ-খণ্ড থেকে বিতাড়িত হয়ে কিংবা স্বেচ্ছায় নির্বাসিত হয়ে এ এলাকায় মানুষ প্রথম বসতি স্থাপন করে। যতদূর জানা যায়, খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকের প্রথম দিকে ব্রহ্মপুত্র নদের পূর্ব পার্শ থেকে আসামসহ এ বিস্তীর্ণ এলাকা কামরূপ রাজ্যের অধীন ছিল এবং খ্রীষ্টীয় চতুর্দশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে খালিয়াজুরী কামরুপ রাজ্যের রাজধানী ছিল।৮ অষ্টম, নবম, দশম ও একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত হাওরাঞ্চলে আসাম কুচবিহার ত্রিপুরা থেকে কৌম গোষ্ঠী কোচ, হাজং, খাসিয়া, বানাই, মনিপুরী, গারো ও রাজবংশী সম্প্রদায় বসতি স্থাপন করে। কোচদের সংখ্যাধিক্য থাকায় তারা এ অঞ্চলে রাজত্ব কায়েম করে। জনশ্রুতি রয়েছে সম্পন্ন হাওরাঞ্চল এক সময়ে কোচদের একটি স্বাধীন রাজ্য ছিল এ বিষয়ে অনেক ঐতিহাসিক সূত্র রয়েছে। কোচদের বিশেষ করে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম ও ইটনা এবং সুনামগঞ্জের ছাতকে জনবসতির ইতিহাস পাওয়া যায়। তন্মধ্যে অষ্টগ্রামে সর্বাধিক কোচদের জনবসতি ছিল তার যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। জনশ্রুতি মতে, কোচ পরিবারের সদস্যগণ অপর কোনো কোচ পরিবারের পুকুরে স্নান/গোসল করত না। প্রত্যেক পরিবারেরই আলাদা পুকুর ছিল। অষ্টগ্রামে সরকারি হিসাবে ১৯৯২ সালে ২৬৩৯টি ছোট-বড় পুকুর ছিল। হাওর এলাকার একটি দুর্গম উপজেলায় এতগুলো পুকুর আমাকে অবাক করে দেয়। কোচরা কোচবিহার থেকে, ত্রিপুরাগণ ত্রিপুরা থেকে, উড়িয়াগণ উড়িষ্যা থেকে এ অঞ্চলে এসেছিলেন বলে মনে করা হয়।

অষ্টগ্রামের বেশ কয়েকটি পুকুর উড়িয়ারা বিল নামে পরিচিত। জনশ্রুতি মতে, উড়িষ্যা হতে আগত উড়িয়াগণ এসব পুকুর খনন করে এবং এর চারপাশে বসবাস করত। ত্রিপুরা, কোচ, হাজং, খাসিয়া উড়িয়া প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর লোক তাদের মঙ্গোলীয় দেহসৌষ্ঠব কিংবা নিজেদের পেশা নিয়ে চলে গেছে পাহাড়ের গোত্রে। কালের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তারা বাসস্থান উঠিয়ে চলে গেছে। যদি কেউ অবশিষ্ট থেকেও থাকে এরা আর্য, অনার্য জনগোষ্ঠীর মতো নিজস্ব ভাষা, কৃষ্টি বদলে গিয়ে বিলীন হয়ে গেছে। খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত বিভিন্ন উপজাতি কোচ, হাজং, গারো, খাসিয়া এবং অন্যান্য নিম্নবর্ণে আবাসস্থল হয়। হাওরাঞ্চলের দুর্গম উপজেলাসমূহের মধ্যে সভ্য মানুষের জনবসতি সম্ভবত কিশোরগঞ্জ জেলার অষ্টগ্রামেই প্রথম। এ উপজেলায় খ্রিষ্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীতে অনন্ত দত্ত নামে এক কায়স্থ প্রথম কাস্তুল নামক স্থানে বসতি স্থাপন করেন। তিনি ছিলেন বঙ্গাধিপতি বল্লাল সেনের কৌলিন্য প্রথা বিরোধী আধাসামন্ত। বল্লাল সেনের প্রবর্তিত কৌলিন্য প্রথার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে তিনি পরাজিত এবং তার রাজ্য সীমানা থেকে বিতাড়িত হন। অনন্ত দত্ত নিজ গুরু শ্রী কন্ঠদ্বিজ ও স্বীয় অনুচরবর্গসহ কাস্তুল আগমন করেন। প্রথম কায়স্থ হিসাবে বসতি স্থাপন করায় জায়গাটির নাম ‘কায়স্থ স্থল’ বা কাস্তুল হয়েছে বলে মনে হয়। তখন এ স্থানে কৌলিন্য প্রথার বাড়াবাড়ি ছিল না। অনন্ত দত্তের পরিচয়জ্ঞাপক নিম্নলিখিত শ্লোকটি প্রণিধানযোগ্য :
চন্দ্রতু শূন্যাবিনি সংখ্য শকে বল্লালভীত: খলু দত্তরাজা।
শ্রীকন্ঠ নম্না ওবুনা দ্বিজেন, শ্রীমাননন্তৌ বিজহৌচ বঙ্গম।

মনে হয় অনন্ত দত্তের আগমনের পূর্বে অর্থাৎ দ্বাদশ শতকের পূর্বেই অষ্টগ্রামে জনবসতি ছিল এবং কৌলিন্যবোধসম্পন্ন অভিজাত হিন্দু এ অঞ্চলে ছিল না।

ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম দিকে সবচেয়ে বেশি মানুষ হাওরাঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিল। শাসকশ্রেণীর মধ্যে ক্ষমতার লড়াই এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে শান্তিপূর্ণ আবাসস্থলের খোঁজে মানুষ দলে দলে ব্রহ্মপুত্র নদ পাড়ি দিয়ে পূর্বদিকে চলে আসে। ব্রহ্মপুত্র সে সময় পদ্মা নদীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার বাসনায় পশ্চিমমুখী হয়ে পড়লে এর মূলধারা সংকুচিত হয়ে আসে, ফলে এ নদ পাড়ি দেয়া সহজসাধ্য হয়ে পড়ে।

ষোড়শ শতাব্দীর কবি নারায়ণ দেবের মনসামঙ্গল কাব্যে এর প্রমাণ মেলে
নরহরি তনয় হয়, নরসিংহ পিতা
মাতাসহ প্রভাতকর রুক্সিনী মোর মাতা
বৃদ্ধ পিতামহ মোর দেব উস্কারণ
রাঢ় দেশ ছাড়িয়া যে আসিলা আপন
পূর্ব পুরুষ ছিল মোর অতি শুদ্ধমতি
রাঢ় দেশ ছাড়িয়া যে আসিলা আপন
পূর্ব পুরুষ ছিল মোর অতি মুদ্ধমতি
রাঢ় দেশ ছাড়িয়ো বোরো গ্রামেতে বসতি।

উপত্যকায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে চতুর্দিক থেকে আসা জনমানুষকেই নির্দ্ধিধায় বুকে তুলে নিয়েছে। এ উদারতার ফলশ্রুতিতেই আজ বিশেষ করে বাংলার মুসলমানদের আগমনের পর তুর্কী, আফগান, মোঘল প্রভৃতি থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, ১৫৯২ সালে উড়িষ্যায় আফগানদের পরাজয়ের পর এখানে বিপুল সংখ্যক আফগান বসতি স্থাপন করে। তবে সেই আফগান জনগোষ্ঠীকে এখন আর চেনা যায় না। কেউ কেউ মনে করেন মোঘল সেনাদের একটি বড় অংশ এ এলাকায় আশ্রয় নিয়েছিল। এখন তাদেরকেও চেনা কঠিন। অঞ্চলটি এতই দুর্গম যে ব্রিটিশ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ওয়ারেন্ট ও কমিউনিস্টরা এ এলাকায় আশ্রয় গ্রহণ করতেন। ১৬১২ সালে মুসলিমদের সিলেট বিজয়ের পর এখানে মুসলমানদের বসবাস বাড়তে থাকে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ১৭৮০ সাল থেকে বিশ শতক পর্যন্ত এ এলাকায় জনবসতি কমতে থাকে। বিশ শতকে জনবসতি আবার বাড়তে থাকে। একই ধরনের ঘরবাড়ি বা একই ধরনের চাষাবাদ এবং একই ধরনের ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থা থাকলেও এখানে বসবাসকারীরা প্রধানত দুটি ধারায় বিভক্ত হতে পারে। প্রথমত এখানে কোনো অতিপ্রাচীন বসতি নেই। উপজাতিরা বিরূপ প্রকৃতির কারণে বসবাস না করতে পেরে পাহাড়েই ফেরত গেছে।

এ অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষ সম্পর্কে অনেক ধরনের জনশ্র“তি রয়েছে। যেমন আজ থেকে ৫০০/৬০০ বছর আগের যেসব মুসলমান বা হিন্দুরা সাধারণত দেশের বিভিন্ন মহকুমা থেকে এসেছে তাদেরকে অনেক জায়গায় সিলটি/ পুরাতন বস্তি/অনাবাদী/জংগলী বলে আখ্যায়িত করে থাকে। এ অঞ্চলে ৩০০ বছর আগে ব্যাপকভাবে যে জনগোষ্ঠীর আগমন ঘটে তারা বৃহত্তর কুমিল্লা, বৃহত্তর ঢাকা, বৃহত্তর ময়মনসিংহ, বৃহত্তর নোয়াখালী থেকে এসেছে তারাই এ অঞ্চলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। তাদেরকেও নতুন বস্তি/ আবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকে।

হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা যারা এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছেন তারা অধিকাংশ বরেন্দ্র অঞ্চল থেকে আগত বিদ্রোহী কৈবর্ত। যারা সবাই ক্ষত্রিয় সম্প্রদায়ের লোক। তারা জীবিকার তাগিদে বেশির ভাগই জেলে এবং কৃষকে রূপান্তরিত হয়েছে।
হাওরাঞ্চল মূলত গারো, খাসিয়া ও জৈন্তিয়া পাহাড়ের অতিরিক্ত পলি ভরাটের ফলে মানুষের জনবসতি গড়ে ওঠার পাশাপাশি চাষাবাদের উপযোগী হয় বলে এটি সমতল ভূমিতে পরিণত হয়েছে। কেননা এ অঞ্চলে পলি ভরাটের প্রকট এত বেশি ছিল যাঁর একটি বড় উদাহরণ বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সলুকাবাদ ইউনিয়নে ৩০০ বছর আগে ধোপাজান এবং পলাশ ইউনিয়নে ধামালিয়া নামক দুটি খরস্রোতা নদী ছিল। কালের আবর্তনে পাহাড়ি ভরাটের ফলে বর্তমানে দুটি নদীর কোনো অস্তিত্ব নেই। তাছাড়া হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন নদী, খাল-বিল প্রভৃতি প্রতি বছর পলি ভরাট হতে হতে ধ্বংসের সম্মুখীন। তাতেই প্রমাণিত হয় এক কালের লোহিত্য/কালীদহ সাগর আজকের হাওরাঞ্চল মূলত গারো, খাসিয়া এবং জৈন্তিয়া পাহাড়ের পলি ভরাটের ফলেই সৃষ্টি হয়েছে এ বিষয়ে দ্বিমত করা যায় না।

এ বিষয়ে হাওরাঞ্চলের অনেক গবেষকদের ভিন্নমত রয়েছে তাদের মতে, পূর্বে এলাকাটি সমতল অঞ্চল ছিল। ভূমিকম্পের ফলে এ অঞ্চল নিচু এলাকায় রূপান্তরিত হয়েছে। তাদের যুক্তির মধ্যে রয়েছে এ অঞ্চলের ভূ-গঠন, নদীর অনুকূলে পাওয়া বড় বড় গাছের গুঁড়ি, পিতল কাঁসার, তৈজসপত্র ও টিনসমূহ। আবার এ বিষয়েও গবেষকদের ভিন্নমত রয়েছে তাদের মতে, যেসব আসবাবপত্র এবং বড় বড় গাছের টুকরা পাওয়া যায় তা পাহাড়ে অধিক ঝড়-বৃষ্টি হলে ঢলের মাধ্যমে আসতে পারে। ভূমিকম্প হয়ে থাকলেও সাগরের মাঝে হতে পারে। এমনিভাবে লোহিত্য/ কালিদহ সাগরের বুকে জেগে উঠে এ রহস্যময় হাওরাঞ্চল।

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!