ক্লাসিক বুক সিরিজ: ম্যাকিয়াভেলির ‘প্রিন্স’

Reading Time: 11 minutes

ক্লাসিক বুক সিরিজ: ম্যাকিয়াভেলির ‘প্রিন্স’

আলোচক: সাবিদিন ইব্রাহিম

১৫.০৭.২০১৭

ডাকসু ভবন

বাংলাদেশে ম্যাকিয়াভেলির ‘দ্য প্রিন্স’ এর সবচেয়ে জনপ্রিয় উক্তিটি কি? যেটা সবাই জানে? আমার মনে হয় কেউ এখানে ভুল করবেন না বা বইটি না পড়েও এই কথাটি আপনার কাছে পরিচিত সেটা হলো: ‘শাসককে হতে হবে সিংহের মতো সাহসী, শিয়ালের মতো ধূর্ত।’ আচ্ছা কেন এমনটা হতে হবে বলে মনে করেন। বা এর পরের কথাগুলোই বা কি? এরকম প্রশ্ন করলে আপনার মাথায় কি আসবে? আর ম্যাকিয়াভেলি কি বলে গিয়েছেন?

(১৮ তম অধ্যায়ে সিংহ ও শিয়ালের কথা এসেছে। শাসক তার প্রতিশ্রুতি রাখবে কি রাখবে না এ সংক্রান্ত আলোচনায় এটা উঠে আসে।

ম্যাকিয়াভেলির কথাটা হচ্ছে:

…he should choose from among the beasts the fox and the lion; for the lion cannot defend itself from traps, while the fox cannot protect itself from the wolves. It is, therefore necessary to be a fox, in order to recognize the traps, and a lion, in order to frighten the wolves.

বুদ্ধিমান শাসক তাই কথা দিলে প্রয়োজনে সেটা ভঙ্গ করতে পারেন। রাষ্ট্র ও নিজে যদি ঝামেলায় পরতে পারে বলে মনে হয় তাহলে প্রতিশ্রুতি থেকে সড়ে আসতে হবে।

প্রমিজেস আর মেড টু বি ব্রোকেন!

রাজনীতিতে এটা আমরা স্পষ্ট দেখতে পারবো কীভাবে কত চুক্তি, প্রতিশ্রুতি ভাঙ্গা হয়েছে, হচ্ছে রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের, ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির।

এরকম কয়েকটি প্রশ্ন দিয়ে আলোচনা শুরু করলাম। আপনারাও আমার সাথে আলোচনায় প্রবেশ করুন। আজকে ম্যাকিয়াভেলির প্রিন্স আলোচনায় জনপ্রিয় কিছু বয়ান এবং অজনপ্রিয় কিছু ব্যাখ্যা, অজানা কিছু তথ্য নিয়ে আসার চেষ্টা করবো। আবিষ্কার করার চেষ্টা করবো লিখিত হওয়ার পাঁচশো বছর পরও কেন প্রিন্স এখনো প্রাসঙ্গিক। কেন বিশ শতকের কিংবা একুশ শতকের নেতারাও ম্যাকিয়াভেলির পরামর্শকে ফেলে দিতে পারছে না। আর কিভাবেই ম্যাকিয়াভেলি আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক হিসেবে স্বীকৃত হন কারো কারো কাছে। ম্যাকিয়াভেলিকে অনুসরণ করে কিভাবে অনেকেই রাজনীতির মঞ্চে সফলতা দেখিয়েছেন আবার তাকে অবজ্ঞা করে ব্যর্থতার বৃত্তে আবর্তিত হয়েছেন।

আমাদের সময়কালের কয়েকজন আলোচিত রাষ্ট্রপ্রধানকে ম্যাকিয়াভেলির ছকে ফেলে দেওয়া যাবে। দেখা যাবে তারা কিভাবে ম্যাকিয়াভেলির চিন্তার প্রতিমূর্তি। ভ্লাদিমির পুতিন এর ক্যারিয়ার অভিযানে নজর দিলে দেখবো ম্যাকিয়াভেলির চিন্তাকে, ট্রাম্পের উত্থানে দেখবো ম্যাকিয়াভেলি, টনি ব্লেয়ার তার পুরো ক্যারিয়ারে বারে বারে ম্যাকিয়াভেলিয়ান হিসেবে গালির শিকার সমীহের ভাগিদার হয়েছেন, রিচার্ড নিক্সন ও তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিনজারের বিছানার পাশে একখণ্ড প্রিন্স থাকতো বলে জানা যায়। আর ফ্যাসিবাদী নেতা ইতালীর মুসোলিনি ‘দ্য প্রিন্স’ এর উপর থিসিস করেছিলেন। ইতালীর কমিউনিস্ট চিন্তক ও নেতা আন্তোনিও গ্রামসি।

নেপোলিয়ন পড়েছেন, স্টালিন বইয়ের মার্জিনে মন্তব্য লিখেছেন, মুসোলিনি থিসিস লিখেছেন, পপুলার বেডসাইড রিডিং ফর নিক্সন এন্ড কিসিনজার।

হেনরি কিসিনজারকে তার ভক্ত বা সমালোচকরা আমেরিকার ম্যাকিয়াভেলি বলে থাকেন।

ম্যাকিয়াভেলির জগতে আমরা প্রবেশ করে ফেলছি। ঈগলের মতো দেখবো-শুধু টার্গেট এরিয়াতে আঘাত হানবো। ৪০ মিনিটে পিন পয়েন্ট আলোচনা নয়, বা পদযুগে ভ্রমণ নয় আমরা ঈগলের পিঠেই চড়বো বা কোন হেলিকপ্টারে।

কিছু ডয়ালেক্টিক বিষয় উঠে এসেছে প্রিন্সে। যেমন:

ভয় বা ভালোবাসা-কোনটা নেবো?

ভয় ও ভালোবাসা-ফিয়ার এন্ড লাভ-দুটো রাখতে পারা উত্তম। কিন্তু দুটোর মধ্যে কমপেয়ার বা বাছাই করতে হলে ফিয়ার গ্রহণ করতে হবে। কারণ মানুষ কঠিন সময়ে ভালোবাসা ভুলে যেতে পারে। মানুষের প্রকৃতি হবসের ভাষায় ন্যাস্টি, ব্রুটিশ এন্ড শর্ট। হবস ম্যাকিয়াভেলি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন সেটা সুস্পষ্ট।

ম্যাকিয়াভেলি ফিয়ার নিয়ে বলেন কঠিন সময়ে ফিয়ার শক্তি লাভ করে যেখানে ভালোবাসা দুর্বল হয়ে যায়। এজন্য শাসকের জন্য ফিয়ারকে বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ।

বেশিরভাগ মানুষই ম্যাকিয়াভেলির মতে দুর্বল ও ভঙ্গর; নিজ স্বার্থ দ্বারা তাড়িত। তাদেরকে একত্রিত করতে হলে, তাদেরকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে হলে কোন সুতায় বাধা যাবে? ভালোবাসা না ভয়?

ভাগ্য/ফরচুন না ভার্চ্যু

নদীর ঢলের মতো। এটাকে ডিরেক্ট করতে হয়, তার জন্য আগাম প্রস্তুতি নিতে হয়। আগাম প্রস্তুতি থাকলে নিজের সুবিধায় কাজে লাগানো যায়। প্রস্তুতি নিয়ে রাখলে ভাগ্যের উপরও অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ রাখা যায়।যে আগাম প্রস্তুতি নেয়না তার কাছে সুযোগ আসলেও সুযোগ গ্রহণ করা বা সুযোগের সদ্ব্যবহার করার সৌভাগ্য হয়না।

আর ভার্চ্যু বা বীরত্মের মাধ্যমে সবকিছুই অর্জন করা সম্ভব।

ইয়ালে ইনসাইটস এ স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ইতালিয়ান ও ফরাসীর চেয়ার প্রফেসর রবার্ট পি হ্যারিসন লিখেন:

Now there’s a slight problem here. The word virtù occurs 59 times in The Prince, and if you look at the Norton critical edition, you’ll notice that the translator refuses to translate the Italian word virtù with any consistent English equivalent. Depending on the context, virtù is translated as virtue, strength, valor, character, ability, capability, talent, vigor, ingenuity, shrewdness, competence, effort, skill, courage, power, prowess, energy, bravery, and so forth. So for those of you who read The Prince in English, you may not fully appreciate the extent to which Machiavelli’s political theory is wholly determined by his notion of an enduring antagonism between virtù and Fortuna.

It is, in fact, impossible to translate with one English word the Italian Virtù, but it’s important that we come to terms with what Machiavelli means by it because it has everything to do with his attempt to divorce politics from both morality and religion. He knew full well that he was taking a traditional word and evacuating it of all its religious and moral connotations.

Let me give you some more terms which I think encompass the meaning of Virtù in The Prince: I think probably the best word we have in English would be “ingenuity.” The prince’s supreme quality should be ingenuity or efficacy. He should be efficacious. Another good word for it is foresight because if you look at the concept of virtue in The Prince you’ll find that the most virtuous prince is the one who can predict or anticipate fortuitous occurrences within his state.

The great antagonist of virtù is Fortuna, which we must understand as temporal instability—the flux and contingency of temporal events. In fact, love, as opposed to fear, falls under the rubric of fortune, because love is fortuitous, you cannot rely on it, it is not stable, it is treacherously shifty. Therefore it’s obviously better for a prince to be feared rather than loved, since fear is a constant emotion, which will remain true to itself no matter how much circumstances may shift.

ম্যাকিয়াভেলির সময়কাল

রেনেসাঁ, কোপার্নিকাস মহাকাশ স্টাডি করছেন, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি মানুষকে স্টাডি করছেন-ডিরেক্ট অবজার্বেশনের মাধ্যমে। তারা মহাবিশ্ব ও মানুষের আকার ও প্রকৃতিকে অ্যানাটোমাইজ করেছে আর ম্যাকিয়াভেলি রাজনীতির দুনিয়াকে। ক্রিস্টোফার কলম্বাস ও ভাস্কো দা গামা সমুদ্রপথে নতুন নতুন সম্ভাবনাময় ভূখণ্ড কুজে বের করছেন।

ফিউডাল সোসাইটি বড় ধাক্কার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জার্মানিতে মার্টিন লুথার এর সংস্কার আন্দোলন ও নাইনটি থিসিস আলোড়ন সৃষ্টি করছে, ব্রিটেনের রাজা অষ্টম হেনরি বিয়ে করতে না দেওয়ায় রোমের ক্যাথলিক চার্চের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করছেন, তার পাদ্রী স্যার থমাস মুর ‘ইউটোপিয়া’ লিখছেন আবার অষ্টম হেনরির হাতে কেল্লা হারাচ্ছেন-একম টালমাটাল ইউরোপ। তার মধ্যে ইতালীর নগর রাষ্ট্রগুলো ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত হয়ে একে অন্যের সাথে যুদ্ধবিগ্রহে লেগে থাকতো।

It was a turbulent time of conflicts and contradictions.

এই ব্যাকগ্রাউন্ডে ম্যাকিয়াভেলিকে স্টাডি করার পাশাপাশি আমরা তাকে বর্তমানে নিয়ে আসবো।

এথিক্স ও থিওলজি থেকে রাজনীতির জুদা ঘোষণা করেন ম্যাকিয়াভেলি

প্রায় দেড় যুগের মতো কূটনীতিক/দূত হিসেবে ইউরোপের প্রধান শক্তিঘর এবং তাদের প্রধান চরিত্রদের খুব কাছ থেকে দেখেছেন ম্যাকিয়াভেলি। পাওয়ার কিভাবে আচরণ করে, এর সত্যিকার স্বরূপ তা সরাসরি দেখেছেন। তাকে নাস্তিক বলা হলেও সে বিশ্বাসী খ্রিস্টানই ছিলেন। তবে তার আলোচনায় ধর্মকে পাশ কাটিয়ে রাজনীতির আসল রূপটা এবং ক্ষমতায় সফল হওয়ার ফর্মূলা জানিয়েছেন।

সিজার বোর্গিয়ার কর্মকাণ্ড খুব গভীরভাবে অনুধাবন করার চেষ্টা করেছেন। সফল শাসকদের কিছু গুণের সামঞ্জস্য দেখতে পেয়েছেন।

বইটির মাধ্যমে চাকুরী খুজেছেন ম্যাকিয়াভেলি কিন্তু রাজনীতিবিজ্ঞানের ইতিহাসে বেশ সম্মানের জায়গা নিয়ে ফেললেন। ম্যাকিয়াভেলি তার সে সফলতা দেখে যেতে পারলেন না সেটা ট্রাজিক ঘটনা।

তাকে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড ক্রিমিনাল’ বলে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট জারি করা হয়েছিল।

নিজস্ব সেনাবাহিনীর গুরুত্ব অনুধাবন-

কলোনি শাসনের মৌলিক রীতি

বইটি নিয়ে মজার তথ্য হচ্ছে এটার নাম দ্য প্রিন্স বা প্রিন্সিপালিটিজ কিছুই রেখে যাননি ম্যাকিয়াভেলি। তার মৃত্যুর পাঁচ বছর পর এটা প্রকাশিত হলে সম্পাদকরা এমনতর নাম রাখেন।

বইটি মূলত দুটি মূল থিমের উপর লেখা/আবর্তিত:

১. কীভাবে ক্ষমতা গ্রহণ করতে হয়

২. কীভাবে ক্ষমতা ধরে রাখতে হয়

বইটির প্রথম অর্ধভাগে ক্ষমতা অর্জনের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করেছেন আর শেষ অর্ধভাগে ক্ষমতা ধরে রাখার প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলেছেন। এটা হলো সহজ বিভাজন।

আরও স্পষ্টভাবে ভেদরেখা স্পষ্ট করতে গেলে, বইটির প্রতিটি অংশের পরিচয়  করে দিতে গেলে বলতে হবে।

  • বইটির ২৬ টি চাপ্টার
  • ১ থেকে ১১ চাপ্টারে বিভিন্ন ধরণের রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে কথা বলা হয়েছে
  • ১২ থেকে ১৪ তম চাপ্টারে বিভিন্ন ধরণের সেনাদল নিয়ে কথা বলা হয়েছে এবং একজন প্রিন্স মিলিটারি লিডার হিসেবে কেমন আচরণ করবেন সেটা নিয়ে বলা হয়েছে
  • ১৫ থেকে ২৩ তম চাপ্টারে প্রিন্স বা শাসকের চরিত্র, আচরণ নিয়ে কথা বলা হয়েছে
  • ২৪ থেকে ২৬ তম চাপ্টারে ইতালির তৎকালীন দুরবস্থা নিয়ে কথা বলা হয়েছে এবং সে অবস্থা থেকে কিভাবে উত্তরণ করা যায় সেটার দিক নির্দেশনা এবং আহ্বান জানানো হয়েছে।

ল্যাটিন ওরেটোরিয়াল লিটারেচার অনুসরণ করে এটি রচিত হয়েছে।

এক্সপোজিশন, ইলাভোরেশন, আপিল-

রাষ্ট্রের রোগবালাই

রোগ আগে থাকা অবস্থায় চিকিৎসা কাজের, রাষ্ট্রের সমস্যার প্রাথমিক স্তরে হাত দিলে সমাধান আসতে পারে। বেশি ঘনিয়ে গেলে রোগ মুক্তি যেমন সম্ভব নয় তেমনি রাষ্ট্রের ভয়াবহ পরিণাম থেকে ফেরা সম্ভব নয় যদি প্রথমদিকেই সমস্যা সমাধানে হাত না দেওয়া হয়।

আমরা এবার চলেন চাপ্টার টু চাপ্টার সংক্ষিপ্ত আলোচনা শুরু করি। প্রতি চাপ্টারের গুরুত্বপূর্ন লেসনগুলো নিয়ে আসার চেষ্টা করবো।

 ব্রিটেনে ম্যাকিয়াভেলি ও প্রিন্স কুখ্যাতি লাভের পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে ফ্রান্সে রাণী ক্যাথরিন দ্য মেডিসি কর্তৃক ‘প্রোটেস্টান্ট’দের উপর খড়গ চালানো। লরেঞ্জো দ্য মেডিসি কন্যা ৫০ হাজার হুগনট বা প্রোটেস্টান্টদের হত্যা করেছিলেন। এজন্য ব্রিটেনের প্রোটেস্টেন্ট ও ক্ষমতা কাঠামোর কাছাকাছি মানুষদের কাছে ঘৃণিত ছিলেন। ব্রিটিশরা এর ফলে এনিথিং ফ্লোরেন্সিয়ান জিনিসপাতি অপছন্দ ও ঘৃণার চোখে দেখতো। ফ্লোরেন্সের ম্যাকিয়াভেলিকে ইভিলের সমার্থক হিসেবে দেখতো। ক্রিস্টোফার মার্লোর ‘জু অব মাল্টা’, তেমারলেন, উইলিয়াম শেইক্সপীয়রের ‘ম্যাকবেথ’, ‘ওথেলোর ইয়াগু’ ‘কিং লিয়ার, জুলিয়াস সিজার, রিচার্ড দ্য থার্ড সহ বিভিন্ন নাটকে ম্যাকিয়াভেলির প্রভাব স্পষ্ট ধরা পরবে।

প্রিন্সের তাৎপর্য্য

  • মধ্যযুগীয় খ্রিস্টিয় রাজনীতির মধ্যগগনে ধর্ম থেকে রাজনীতির জুদা ঘোষণা করেছে প্রিন্স।
  • কূটনীতিকদের জন্য আকর গ্রন্থ
  • ম্যানেজম্যান্ট ও বিজনেসে গুরুত্বপূর্ণ ইনসাইট পাওয়া যায় এখানে
  • এটাকে ‘হ্যান্ডবুক অব ইভিল’ ও মনে করেন কেউ কেউ। যেমন অক্সফোর্ড এর এ বইটির ভূমিকাতে এমন ফ্রেইজটিই ব্যবহৃত হয়েছে।
  • গোয়েন্দাদের জন্য অবশ্যপাঠ্য বই। ম্যাকিয়াভেলি নিজে গোয়েন্দার কাজ করেছেন। যেমন পুতিন ছিলেন কেজিবির বড় গোয়েন্দা। জিয়াউর রহমান ও ছিলেন পাকিস্তান আর্মি গোয়েন্দাবিভাগের সদস্য। বাংলাদেশে জিয়া ও এরশাদের মধ্যে ম্যাকিয়াভেলিয়ান গুণাবলীর উপস্থিতি লক্ষ্য করে থাকে তোর সমালোচক ও রাজনীতি বিশ্লেষকরা।

প্রিন্স চাকুরীর জন্য আবেদনপত্র। ম্যাকিয়াভেলি যে একজন দক্ষ রাজনীতি বিশেষজ্ঞ এবং সে যে রাষ্ট্রব্যবস্থাপনা ভালো বুঝে সেটা দেখানোর প্রয়াসে লরেনজো দে মেডিসিকে উৎসর্গ করে প্রিন্স লিখেন। খুবই ট্রাজিক বিষয় হচ্ছে যাকে উদ্দেশ্য করে সেটি লিখেছিলেন সে পড়তে ও উপকৃত হতে পারেনি বলেই মত্ কারন বছর দুয়েকের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়েছিল। এরপর অপর আরেকজন প্রিন্সকে উৎসর্গ করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেও নাকি মারা গিয়েছিল। মানে ম্যাকিয়াভেলি মারা যান বেশ ব্যর্থ মানুষ হয়েই। নিজের বইয়ের এরকম সফলতা দেখা তো দূরের কথা তার চিন্তার সফল প্রয়োগটা তিনি নিজে দেখে যেতে পারেননি। অথচ শত শত মানুষ অনুপ্রেরণা নিয়ে সরকার ও রাষ্ট্রব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করছে।

ডিসকোর্সেস অন লিবি লিখতে গিয়ে প্রিন্সের কথা মাথায় আসে। আসলে তখন তার চাকুরী দরকার ছিল। সে যে রাষ্ট্র কাঠামোতে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার সক্ষমতা রাখে সেটা দেখানোর জন্য প্রিন্স লেখা শুরু করেন। মাত্র তিন মাসে সেটা লেখা শেষ করেন বলে জানা যায়।

ভয় হচ্ছে সবচেয়ে সফল অস্ত্র। কাউকে এমনি ভয় দেখালে হেসে উড়িয়ে দেয়, নিজের কাজটা নিজে শেষ করতে পারে না। ভালোবাসা  ও ভয়ের মধ্যে কোনটা গ্রহণ করতে হবে তার পরামর্শ দিতে গিয়ে ভয়ের পক্ষেই রায় দেন।

আর নিজের জনগণকে অস্ত্রে সজ্জিত রাখতে বলেন। জনতাকে নিরস্ত্র করার মেডিসিয়ান পলিসি থেকে দূরে সড়ে আসেন ম্যাকিয়াভেলি।

একজন শাসকের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে যুদ্ধ। সান জুর মতো তিনি বলেন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে ‘যুদ্ধ’। মজার ব্যাপার হলো তিনি ‘দি আর্ট অব ওয়ার’ নামে একটি বইও লিখেন।

ম্যাকিয়াভেলি প্রচলিত সামরিক ব্যবস্থার বদলে নতুন সামরিক বাহিনীর আইডিয়া দেন, আধুনিক রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী ম্যাকিয়াভেলির কাছে ঋণী। কারণ এর আগে বিভিন্ন শাসক সৈন্যদলের জন্য মার্সিনারি সেনাদলের উপর নির্ভর করতেন। ম্যাকিয়াভেলি তার প্রিন্সে দেখিয়েছেন কিভাবে এটা ক্ষতিকর। নিজ ভূখণ্ডের বাসিন্দাদের দিয়েই সেনাদল গড়তে হবে। এটা অনেক শক্তিশালী ও দৃঢ় বলে মনে করেন তিনি। জনতাকে নিরস্ত্র করার মেডিসিয়ান পলিসি দেশকে দুর্বল করে দেয়। ম্যাকিয়াভেলি দেখেছেন কিভাবে ইতালিয়ান শহরগুলো ফ্রান্স, স্পেন বা অন্যান্য শক্তিশালী রাজের দখলে চলে যেতো।

দুর্গ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে এর প্রয়োজনীয়তা, অপ্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলাপকালে ম্যাকিয়াভেলি বলেছেন দুর্গ করা প্রয়োজনীয় তবে ভালো প্রজা, প্রজাদের সুখ-শান্তি নিশ্চিত করা হচ্ছে সবচেয়ে বড় দুর্গ। প্রজাদের মনোরঞ্জন নিশ্চিত করতে পারলে বড় বড় দুর্গ করা লাগবে না। প্রজাই শাসকের দুর্গ হয়ে দাড়িয়ে যাবে।

….

সিসেরো দ্বারা বেশ প্রভাবিত ছিলেন ম্যাকিয়াভেলি। গদ্যে সেই গতি ও সৌন্দর্য ধরে রাখতে চেয়েছিলেন তিনি। ১৬শ শতকে ইউরোপে ঘৃণিত হয়ে আসলেও খুব শীঘ্রই ম্যাকিয়াভেলির মান বাড়তে শুরু করে। বিখ্যাত কয়েকজন দার্শনিক এটার ভালো ব্যাখ্যা দাড় করান। দার্শনিক স্পিনোজা তার ‘ট্রেকটেটাস থিওলজিকো পলিটিকাস’ বইয়ে ম্যাকিয়াভেলিকে ‘চ্যাম্পিয়ন অব লিবার্টি’ বলেছেন।

এদিকে ফরাসী বিপ্লবের তিন কারিগরের দুজন খুবই সমীহ করেছেন ম্যাকিয়াভেলিকে। রুশো তার বিখ্যাত ‘সোস্যাল কনট্রাক্ট’ বইয়ে বলেন: ‘তিনি আসলে শাসকদের উপদেশ দেওয়ার বান করে সাধারণ জনতাকে দীক্ষিত করছেন।’

ফরাসী বিপ্লবের অপর ইঞ্জিনিয়ার দিদেরো তার ‘এনসাইক্লোপেডিয়া’ বইতেও ম্যাকিয়াভেলির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। সমসাময়িকরা যে তার সাথে ভুল আচরণ করেছে সেটার কথা বলতে গিয়ে দিদেরো বলেন: ‘তারা (ম্যাকিয়াভেলির সমর্থকরা) যদি ভুল বুঝে তাহলে এটা তাদের দোষ কারণ তারা একটি স্যাটায়ারকে ইউলজি বা প্রশংসাবাণী মনে করেছে।

ম্যাকিয়াভেলিয়ান শব্দটি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়  ৩৫৮ বার উচ্চারিত হয়েছে টনি ব্লেয়ারের প্রথম বছরে।

শাসকের উপদেষ্টারা কেমন হবে?

মহাভারতে ভীষ্ম যে উপদেশ দিয়েছিলেন।

ম্যাকিয়াভেলিতেও একই ধরণের কথা বলেছেন। স্টুপিড উপদেষ্টা বিপদে ফেলবে।

নিক্সন ও কিসিনজার সম্পর্ক। সেখানে ফাটলের কারণ নিক্সন became to afraid of his shadows.

কাছের কিছু লোককে ট্রাস্ট করা জরুরী।

টনি ব্লেয়ারের চিফ অব স্টাফ বই লিখেছেন: নিউ ম্যাকিয়ভেলিয়ান

টনি ব্লেয়ারকে ম্যাকিয়াভেলিয়ান বলার কারণ কি?

জন স্মিথ-বিরোধি লেবার পার্টির নেতা হঠাৎ মারা যান-মিড ফিফটিতে। এতে মাত্র ৪১ বছর বয়সে লেবার পার্টির লিডার হওয়ার দরজা খুলে ব্লেয়ারের।

অপারচুনিটি আসলে সেটা বুঝতে হবে, গ্রহণ করতে হবে। ফরচুন বা ভাগ্য ক্ষমতাশালী কিন্তু মানুষের নিয়ন্ত্রণে রাখার অনেক কিছু আছে।

মার্গারেট থ্যাচারের উপদেষ্টা

দ্য হাউস অব কার্ডস বই লিখলেন ১৯৮৭-৮৮ নিয়ে

সাফল্যের দিনগুলোতে মার্গারেট থ্যাচার ছিলেন ম্যাকিয়াভেলিয়ান চরিত্রের প্রতিমূর্তি। দলে ও দলের বাইরে তিনি ফিয়ার্ড ছিলেন। সে সময় বিরোধি দলীয় নেতা/লেবার পার্টির নেতা জনতার কাছে প্রিয়পাত্র হলেও আগাতে পারেননি কারণ তার মধ্যে ফিয়ারের মসলা ছিল না।

বারাক ওবামা অনেক বড় বড় আদর্শ নিয়ে ক্ষমতায় আসলেও ক্ষমতায় এসে ক্ষমতার আসল চরিত্র অনুধাবণ করেন এবং সে অনুযায়ী কাজ শুরু করেন অন্যদিকে বিল ক্লিন্টন, নিক্সন, এঙ্গেলা মার্কেল, পুতিন প্রাকৃতিকভাবেই ম্যাকিয়াভেলিয়ান। ম্যাকিয়াভেলি পড়ে এমনটা হতে হবে ব্যাপারটা এমন নয়। রাজনীতির মূল সূত্র তাদের ডিএনএ তে।

গেইম অব থ্রোনস এর লেখক জর্জ এ এ মার্টিন ‘দ্য প্রিন্স’ দ্বারা প্রভাবিত। সধারণ কমনসেন্স বলে থাকে তুমি ভালো মানুষ হলে ভালো শাসক হবে। কিন্তু রাজনীতির আসল দুনিয়া পুরো ভিন্নটা বলে। শাসকদের, নেতাদের সবসময় ভালো মানুষ থাকা যুক্তিযুক্ত না, সম্ভবপর না। সফল হতে গেলে বিভিন্ন ভালো-মন্দ পদক্ষেপ নিতে হয়।

এন্ড জাস্টিফাইজ দ্য মিনস

কমন পিপল আর মেসমেরাইজড বাই অ্যাপিয়ারেন্স এন্ড রেজাল্ট

কর্পোরেট দুনিয়ায় নিয়মিত ম্যাকিয়াভেলিয়ান লড়াই মঞ্চস্থ হয়।

Contempt and hatred কেমনে এভয়েড করতে হবে?

শাসককে অতিমাত্রায় ঘৃণিত হওয়া যাবে না। ম্যাকিয়াভেলি তার হাও টু এভয়েড হেট্রেড এন্ড কনটেম্পট’ চাপ্টারে পরামর্শ দিয়েছেন ঘৃণিত কাজ অন্যদের মাধ্যমে করিয়ে নিতে হবে আর নিজের জন্য রাখতে হবে পপুলার কাজ।

সিজার বোর্গিয়ার একটা উদাহরণ দিয়েছেন:

ইতালির রোমানিয়া ডিসট্রিক্ট এর চেজানাতে বিদ্রোহ দমনে তার কঠোর এক সহকারীকে পাঠান। মেসার রেমিরো ডে অর্কো কঠোর হাতে দমন করেন কিন্তু ঘৃণিত হন সেখানকার মানুষের কাছে।

‘বি ফিয়ার্ড এন্ড নট হেইটেড’

Common people are stunted, ‍satisfied and stupified

শাসককে ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে

প্রিন্সের ইতিহাস পাঠ জরুরী এবং ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। অধ্যায় ১৪ তে ম্যাকিয়াভেলি সে প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন। তিনি লিখেন:

…the prince must read histories and in them consider the deeds of excellent man.

He must see how they conducted themselves in wars.

He must examine the reasons  for their  victories and for their defeats, in order to avoid the latter and imitate the former.

তারপর ম্যাকিয়াভেলি কয়েকটি উদাহরণ উপস্থাপন করেছেন।

বলা হয়ে থাকে আলেক্সান্ডার একিলিসকে অনুসরণ করতেন। বলা হয় তার বিছানার পাশ হোমারের ইলিয়াডের এক কপি থাকতো।

সিজার অনুসরণ করতো আলেক্সান্ডারকে। স্কিপিও অনুসরণ করতো সাইরাসকে। জেনোফোন কর্তৃক লেখা সাইরোপিডিয়া দ্বারা খুবই প্রভাবিত হয়েছিলেন স্কিপিও।

আলোচনার মধ্যগগনে আমি এবার বইটির বিভিন্ন চাপ্টার আপনাদের কাছে পরিচিত করার চেষ্টা করবো।

চার ধরণের শাসনব্যবস্থা/প্রিন্সিপালিটিজ এর কথা বলেছেন:

The types of principalities

Machiavelli lists four types of principalities:

(Chapter1-11)

  1. Hereditary principalities, which are inherited by the ruler
  2. Mixed principalities, territories that are annexed to the ruler’s existing territories
  3. New principalities, which may be acquired by several methods: by one’s own power, by the power of others, by criminal acts or extreme cruelty, or by the will of the people (civic principalities)
  4. Ecclesiastical principalities, namely the Papal States belonging to the Catholic church

Chapter (12-14)

এখানে সেনাবাহিনীর গুরুত্ব এবং নিজস্ব সেনাবাহিনী গড়ে তোলার উপর জোর দিয়েছেন ম্যাকিয়াভেলি

The types of armies

A prince must always pay close attention to military affairs if he wants to remain in power. Machiavelli lists four types of armies:

  1. Mercenaries or hired soldiers, which are dangerous and unreliable —-Mercinaries ‘are brave with their friends; with their enemies, they are cowards….They love being your soldiers when you are not waging war, but when war comes, they either flee or desert.’
  2. Auxiliaries, troops that are loaned to you by other rulers—also dangerous and unreliable
  3. Native troops, composed of one’s own citizens or subjects—by far the most desirable kind
  4. Mixed troops, a combination of native troops and mercenaries or auxiliaries—still less desirable than a completely native army

————————–

Table of Contents

Chapter I  How Many Kinds Of Principalities There Are, And By What Means They Are Acquired

Chapter II Concerning Hereditary Principalities

Chapter III Concerning Mixed Principalities

Chapter IV Why The Kingdom Of Darius, Conquered By Alexander, Did Not Rebel Against The Successors Of Alexander At His Death

Chapter V  Concerning The Way To Govern Cities Or Principalities Which Lived Under Their Own Laws Before They Were Annexed

Chapter VI Concerning New Principalities Which Are Acquired By One’s Own Arms And Ability

Chapter VII       Concerning New Principalities Which Are Acquired Either By The Arms Of Others Or By Good Fortune

Chapter VIII      Concerning Those Who Have Obtained A Principality By Wickedness

Chapter IX Concerning A Civil Principality

Chapter X  Concerning The Way In Which The Strength Of All Principalities Ought To Be Measured

Chapter XI Concerning Ecclesiastical Principalities

Chapter XII       How Many Kinds Of Soldiery There Are And Concerning Mercenaries

Chapter XIII      Concerning Auxiliaries, Mixed Soldiery, And One’s Own

Chapter XIV      That Which Concerns A Prince On The Subject Of The Art Of War

Chapter XV Concerning Things For Which Men, And Especially Princes, Are Praised Or Blamed

Chapter XVI      Concerning Liberality And Meanness

Chapter XVII     Concerning Cruelty And Clemency, And Whether It Is Better To Be Loved Than Feared

Chapter XVIII    Concerning The Way In Which Princes Should Keep Faith

Chapter XIX      That One Should Avoid Being Despised And Hated

Chapter XX Are Fortresses, And Many Other Things To Which Princes Often Resort, Advantageous Or Hurtful?

Chapter XXI      How A Prince Should Conduct Himself As To Gain Renown

আজকের কোন তরুণ কেন প্রিন্স পড়বে? আপনি কেন পড়বেন?

আপনি পড়েন বা না পড়েন আপনার বিরোধি শক্তি সেসব অনুসরণ করে যার কথা ম্যাকিয়াভেলির মতো লোকেরা বলে গেছেন। প্রত্যেকেই যে যেখানে আছেন না কেন আপনি যদি বেঁচে থাকেন বা বেঁচে আছেন বলে মনে করেন নিজেকে বক্সিং রিংয়ে আবিষ্কার করবেন।

আপনার সামনে অপশন সীমিত।

যুদ্ধ করতে হবে, হামলা ঠেকাতে হবে। তা না হলে আপনি প্রথমেই নকড ডাউন হয়ে পৃথিবীর লড়াইয়ে টিকে থাকার সক্ষমতা হারাবেন। এখন ম্যাকিয়াভেলির শিক্ষা রাজনীতি, খেলাধূলা, সামরিক বাহিনী থেকে শুরু করে ব্যবসা বাণিজ্য, প্রযুক্তির দুনিয়া, এমনকি যেকোন কর্পোরেট হাউসে গুরুত্বপূর্ণ টেক্সট হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

আপনার ভাবের দুনিয়া, কল্পনার দুনিয়া, নৈতিকতার দুনিয়া যেমনটাই হউক না কেন, যেভাবেই আপনি দেখতে চান না কেন আসল দৃশ্যটা এঁকেছেন ম্যাকিয়াভেলিরা।

পৃথিবী নামক যুদ্ধক্ষেত্রে আপনি না হয় আগ্রাসী হামলাকারী হলেন না কিন্তু বিভিন্ন দিক থেকে আসা হামলা এড়াতে বা ঠেকাতে ম্যাকিয়াভেলিকে খুব আপনজন হিসেবে পাবেন। এটা যেকোন ব্যক্তির জন্য, যেকোন প্রতিষ্ঠানের জন্য আর যেকোন রাষ্ট্রের জন্য আরও বড় করে সত্য!

Spread the love

Related Posts

One Response

Add Comment

error: Content is protected !!