বিজ্ঞান পড়া কেন জরুরি (প্রথম পর্ব)

Reading Time: 5 minutes

বিজ্ঞান আসলে কি? এটা পড়া কি জরুরি? আর বিজ্ঞান পড়া বলতে আসলেই কি বুঝায়? আমাদের মস্তিষ্কে এরকম আরও কিছু প্রশ্ন তৈরি হয় যখন ‘বিজ্ঞান’ শব্দটা শ্রুত হয়। আর আমাদের দেশে যে প্রশ্নটা সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়, সেটা হল “বিজ্ঞান এতো কঠিন কেন”? আসলেই কি বিজ্ঞান অনেক কঠিন? নাকি আমরাই এটাকে কঠিন করে তুলছি?

এই আর্টিকেলটা লিখতে গিয়ে একটা কথা বারবার মনে পড়ছে। উইল ডোরান্টের ভাষায়, “If ideas do not detemine history, inventions do”. অর্থাৎ “কোন তত্ত্ব যদি ইতিহাসকে নির্ধারন করতে না পারে, তাহলে আবিষ্কার সেটা করে”। এরকম বেশ কয়েকটি আবিষ্কার ইতিহাসে রয়েছে, যা সেই যুগই শুধু নয়, বরং পুরো মানবজাতিকেই বদলে দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ মোটর গাড়ি এবং রেল ইঞ্জিনের কথা বলা যেতে পারে। যে আবিষ্কার মানবজাতিকে প্রথম গতি দিয়েছিল।

বিজ্ঞান কি?

বিজ্ঞান শব্দটাকে যদি আলাদা করা হয় তাহলে সেটা দাঁড়ায় ‘বি’ এবং ‘জ্ঞান’। বি মানে হচ্ছে ‘সাধারন’, আর জ্ঞান তো ‘জ্ঞান’ই। একটু সহজভাবে বললে জ্ঞান দাঁড়ায় ‘জানা’তে। সুতরাং বিজ্ঞান মানেই হচ্ছে সাধারন জ্ঞান। অর্থাৎ কোন বিষয় সম্পর্কে জানাই হচ্ছে বিজ্ঞান। কিন্তু নির্দিষ্ট করে বললে বিজ্ঞান আরও ব্যাপক অর্থ বহন করে।

প্রাকৃতিক বিশ্বের ইতিহাস এবং কিভাবে প্রাকৃতিক বিশ্ব কাজ করে তা বুঝার জন্য, বলা ভালো যে, তা ভালোভাবে বুঝার জন্য বিজ্ঞান মানুষের প্রচেষ্টাকে সম্মিলিত করে। আর এই বুঝার প্রক্রিয়া বা ভিত্তি বিজ্ঞান এমনভাবে উপস্থাপন করে যা পর্যবেক্ষণ করা যায় এবং পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণ করা যায়। অন্য কথায় বলা যায়, “বিজ্ঞান সেটাই যা পরীক্ষালব্ধ”।

কোন কিছু বিচার বিশ্লেষণ না করে বিশ্বাস করাকে অন্ধ বিশ্বাস বলে। বিজ্ঞান যুক্তি তর্ক ছাড়াও কোন বিষয়কে খতিয়ে দেখে এবং সেটা প্রমাণের চেষ্টা করে বিশ্বাস করে। পরীক্ষালব্ধ এই বিশ্বাসের একটা শক্ত ভিত থাকে। অন্যান্য বিষয়ের সাথে এটাই বিজ্ঞানের মৌলিক পার্থক্য।

বিজ্ঞান এতো কঠিন কেন?

বিজ্ঞান এতো কঠিন কেন তার উত্তর দেয়ার আগে একটা প্রশ্ন করতে চাই। মানুষের স্বপ্নভঙ্গ হয় কেন? স্বপ্নভঙ্গ হওয়ার অনেক কারণ হয়তো বের করা যাবে এবং ব্যক্তিবিশেষে সেটা আলাদাও হতে পারে। কিন্ত স্বপ্নভঙ্গ হওয়ার ৪টি দার্শনিক কারণও আছে। এই চার কারণের একটি হচ্ছে, “ছোটবেলা থেকে আমরা শুনে অভ্যস্ত যে আমরা যা করতে চাই তা করা কখনোই সম্ভব না”। ঠিক একই ভাবে, ছোটবেলা থেকেই আমাদের শিক্ষক, পরিবার, আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে এটা শুনে আসছি যে ‘বিজ্ঞান অনেক কঠিন’ এবং এই কথাটা শুনতে শুনতে আমরা বড় হই। একটা মিথ্যা যদি বারবার বলা হয়, তাহলে সেটা একসময় সত্য বলে প্রতিষ্ঠা পায়। আর আমাদেরও ভয় তৈরি হয় বিজ্ঞান নিয়ে। আসলেই কি বিজ্ঞান কঠিন? বিজ্ঞান আসলে কঠিন কিছু না, আমরা কঠিন করে দেখি বলেই এটা কঠিন। হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন, “জীবন আসলে জীবনের মতোই। সরলও না, জটিলও না। আমরাই এটাকে সরল অথবা জটিল করি”। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও এই কথা খাটে। বিজ্ঞান ততটুকুই কঠিন, যতটুকু আমরা মনে করি। সবকিছুরই একটা শুরু থাকে, আর শুরুটা সর্বদাই কঠিন এবং চ্যালেঞ্জিং হয়। অন্যান্য ক্ষেত্রে এই কঠিন অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারলেও বিজ্ঞান থেকে সহজে বেরিয়ে আসা যায় না, যার কারণ ছোটবেলা থেকে শুনে আসা সেই কথাটার টনিক হিসেবে কাজ করে যাওয়া এবং হাল ছেড়ে দেয়া। ভালমানের বিজ্ঞান শিক্ষক এবং লেখক বা গবেষক না থাকাও একটা দায়। কিন্তু এক্ষেত্রে একটা সমূহ সমাধান পাওয়া যেতে পারে। কোন কিছুর শুরুতেই যেমন এর আকৃতি এবং অবস্থাগত কোন নির্ধারক থাকে না, তেমনি বিজ্ঞানের শুরুটাও হয়েছিল কোনরূপ নির্ধারক ছাড়া। যারা বিজ্ঞানচর্চা করে গেছেন, তারাই এটাকে একটা রূপ দিতে সক্ষম এবং সফল হয়েছেন। তেমনি, আত্মপ্রচেষ্টা যদি থাকে, তাহলে কোন কিছুই কঠিন নয়। সুতরাং বলা যায় যে, বিজ্ঞানকে যদি সহজভাবে দেখা যায়, তাহলে বিজ্ঞান আসলেই সহজ। বিজ্ঞান পড়া এবং বুঝার জন্য বিজ্ঞানের ছাত্র হতে হয় না। কিন্তু বিজ্ঞানের গভীরে পৌঁছাতে হলে বিজ্ঞান সম্পর্কে বিস্তর জ্ঞান, বিশেষ করে পদার্থ এবং গণিতে দক্ষতা থাকতে হয়। যদি পদার্থ এবং গণিতে দক্ষতা বিস্তরভাবে নাও থাকে, তথাপি বিজ্ঞান বুঝা এবং পড়া সম্ভব যদি পদার্থ এবং গণিতে সামান্য দক্ষতা থাকে। মোটামুটি স্কুল পর্যন্ত পদার্থ এবং গণিত নিয়ে কমবেশি পড়াশুনা থাকে। সেই দক্ষতা নিয়েও বিজ্ঞান আয়ত্ত্ব করা সম্ভব।

বিজ্ঞান পড়া কি জরুরি?

বিজ্ঞানের মাঝেই আমাদের বসবাস। সকালে ঘুম থেকে জাগার পর রাতে ঘুমুতে যাওয়ার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত আমরা যা কিছুই করি না কেন, বিজ্ঞান ছাড়া অসম্ভব। এমনকি ঘুমকেও বাদ দেয়া যাবে না বিজ্ঞান থেকে। বিজ্ঞান কোন কিছুকে ব্যাখ্যা করে, সেটা বিশ্লেষণ করে, তত্ত্ব-উপাত্ত যাচাই করে এবং গ্রহণযোগ্য একটা সিদ্ধান্ত দেয়। এই সিদ্ধান্তগুলোই আবিষ্কার হিসেবে মানুষের কাছে পৌঁছায়। এছাড়াও, যতক্ষণ পর্যন্ত বিজ্ঞান কোন কিছুর প্রমাণ দেয় না, ততক্ষণ পর্যন্ত তা গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠে না।

বিজ্ঞান পড়ার ৪টি প্রয়োজনীয়তা:

  • বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি চিন্তা ও দক্ষতাকে উত্সাহিত করে: বিজ্ঞানের ভিত্তি হচ্ছে চিন্তা করা এবং তা পরীক্ষা করা। চিন্তা এবং পরীক্ষার এই পদ্ধতিই হচ্ছে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। যার শুরুটা হয় একটি চিন্তায় এবং শেষ গ্রহণযোগ্য একটি সিদ্ধান্তে। একজন মানুষ গড়ে প্রায় ৭০ হাজার চিন্তা করতে পারে প্রতিদিন। প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১টি করে চিন্তা। এই চিন্তাগুলো যে কোন সময় একটা রেনেসাঁ হতে পারে, কিন্তু তার জন্য দরকার চিন্তার পাশাপাশি গ্রহণযোগ্য একটি সিদ্ধান্ত ও এর বাস্তবায়ন। আর এই সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার [১] ভেতরেই নিহিত রয়েছে। এটা ছাড়াও, শুধুমাত্র শেখার আগ্রহও তৈরি করতে পারে বিজ্ঞান। পৃথিবীর সবকিছুই কোন না কোন ভাবে বিজ্ঞানের সাথে জড়িত। যে কারণে, বিজ্ঞানের কোন একটি বিষয় নিয়ে পড়তে গেলে, কিংবা গবেষণা করতে গেলেও অন্যান্য বিষয়গুলো চলে আসে। এতে যেমন জানার পরিধি বাড়ে, তেমনি কাজের দক্ষতাও বাড়ে।
  • শেখার জন্য বিজ্ঞান ভালোবাসার এক চরণভূমি: দর্শন আর বিজ্ঞানের পথচলা হাত ধরাধরি করে। যেদিন থেকে দর্শনের শুরু, সেদিন থেকেই বিজ্ঞানের যাত্রা। দর্শন আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়, বিজ্ঞান তার উত্তর দেয়। মানুষ প্রকৃতি থেকে শিখতে পছন্দ করে, প্রশ্ন করতে পছন্দ করে, প্রশ্নের উত্তরের জন্য পথ খুঁজে। এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞান থেকে পাওয়া যায়। যেসব উত্তর থেকে অস্ফুট স্বরে বেড়িয়ে আসে ‘ওয়াও’। আর যেহেতু বিজ্ঞানের সাথে যে কোন বিষয়েরই যোগসাজেশ আছে, তাই বিজ্ঞান পড়লে অন্যান্য বিষয়গুলো যেমন চলে আসবে, তেমনি অন্যান্য বিষয় অধ্যয়ন করতে গেলেও অবধারিতভাবে বিজ্ঞান চলে আসবে। বিজ্ঞানকে তাই যদি পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়, তবে অন্যান্য বিষয়গুলোও অস্পষ্ট থেকে যায়। এছাড়া নতুন নতুন বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে, প্রশ্ন করতে চাইলে বিজ্ঞান হতে পারে তার সেরা একটা মাধ্যম।

একটি ডিএনএ নমুনা

  • বিভিন্ন বিষয় শেখার সোপান: বিজ্ঞানের জন্য নিজেকে তৈরি করা মানে অন্যান্য বিষয়গুলোতেও নিজেকে যোগ্যতর করে তোলা। আধুনিক এই যুগে একাধিক বিষয়ে জ্ঞান না থাকার অর্থ হচ্ছে কয়েক দশক পিছিয়ে থাকা। চাকরির জন্য ইন্টারভিউ দিতে গেলে এটা বেশি পরিলক্ষিত হয় যে, শিক্ষাগত কারণে আমাদের যে বিষয়গুলো পড়া হয়, তার বাইরেও অনেক প্রশ্ন থাকে। সেই বিষয়গুলোতে অজ্ঞতার কারণে অনেক সময় পিছিয়ে থাকতে হয়। বিজ্ঞান এই জায়গাতেও আমাদের সাহায্য করতে পারে। একবার কোন বিষয় বুঝতে সক্ষম হবার পর, বর্তমানে সেই একই বিষয় কিভাবে এখন [২] বুঝা যায় তার একটা তুলনামূলক চিত্র [৩] পাওয়া যাবে যদি বিজ্ঞানে আগ্রহ থেকে থাকে। এভাবেই বিজ্ঞান আমাদের ইতিহাস পড়ার দিকে ধাবিত করে। সেই ইতিহাসকে [৪] ক্রিটিক করতে উৎসাহিত করে।

 

  • পদার্থবিজ্ঞানে আইন্সটাইন এর বিখ্যাত সেই সূত্র

    ভবিষ্যতের জন্য তৈরি: আমাদের জীবনের ভিত্তি পুরোটাই নির্ভর করে আছে বিজ্ঞানের উপর। কৃষিবিজ্ঞান যোগান দেয় স্বাস্থ্যসম্মত খাবার, কিভাবে সেই খাবার উৎপাদিত হবে তা নিশ্চিত করে। চিকিৎসাবিজ্ঞান সুন্দর সুস্থ জীবন নিশ্চিত করে। রসায়নবিজ্ঞান চিকিৎসার জন্য ঔষধের যোগান দেয়। পদার্থ আর গণিত এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় আমাদের নিয়ে যায়। এমনকি আমাদের বসার জন্য চেয়ার, ঘুমানোর জন্য খাট, পড়ার জন্য টেবিল ইত্যাদিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রবাদি কেমন হবে সেটাও বিজ্ঞান দ্বারা নির্ধারিত। পরবর্তি প্রজন্মের জন্য এটা নিশ্চিত করতে হবে যেন তারা বিজ্ঞানে শুধু স্বাচ্ছন্দ্য না, পারদর্শীও হয়।

রসায়ন বিজ্ঞানের একটি পরীক্ষা

টীকা:

[১] বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা বলতে অধিকতর গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তকে বুঝানো হয়েছে।

[২] এখন- বর্তমান অর্থে।

[৩] সময়ের সাথে সাথে সবকিছুই বদলায়, দৃষ্টিভঙ্গিও বদলায়। ৫ বছর আগে কোন বিষয় যেভাবে বুঝতাম, এখন ঠিক একইভাবে বুঝি না।

[৪] ইতিহাস বলতে ইতিহাস বিষয়কে নির্দিষ্ট করে বুঝানো হয় নি। ইতিহাস যে কোন বিষয়েরই হতে পারে।

 

তথ্যসূত্র:

  1. www.globalstudentnetwork.com
  2. www.gly.uga.edu

দ্বিতীয় পর্বে সমাপ্তি…

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!